করোনা এবং টিকা

করোনা বৈশ্বিক মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে নানা রকম গুজব তৈরী হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে এই মূহুর্তে সেটি আবর্তিত হচ্ছে করোনার টিকা নিয়ে। মুফতি (?) ইব্রাহিম নামে একজন তো স্বপ্নে করোনা ভ্যাকসিনের ফর্মুলা পাওয়ার কথা বলে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। পরবর্তীতে তিনিই আবার নতুন ভ্যাকসিনে মাইক্রোচিপ আছে, সেটা দিয়ে তারা (পশ্চিমা বিশ্ব) সবকিছু দেখতে এবং বুঝতে পারবে বলে ঘোষনা দেন।

তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মোটামুটি ৩টি ভ্যাকসিন বাজারে এসেছে এবং তার মধ্যে একটি এখন বাংলাদেশেও দেয়া হচ্ছে। যথারীতি এটি নিয়েও এখন নানা আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। প্রথম যে মিথ্যা কথাটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সেটি হলো এটি ভারতে তৈরী এবং তার কোন অনুমোদন দেয়া হয় নাই। এটি অবশ্য অর্ধ সত্য। এটি ভারতের সিরাম ইনষ্টিটিউটে তৈরী হচ্ছে, কথা সত্য। তবে এটি ভারতের নিজস্ব উদ্ভাবিত করোনার টিকা নয়, যেটি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। ভারত-বায়োটেক নামে একটি স্থানীয় ফার্মসিউটিক্যাল কোম্পানির তৈরি কোভ্যাক্সিন এখনও অনুমোদন পায়নি, যার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনও চলছে বলে জানি। দূর্মূখেরা এই তথ্যটিই প্রচার করছে বাংলাদেশে আসা করোনার টিকা সম্পর্কে। বাংলাদেশে ভারতের সিরাম ইনষ্টিটিউটে তৈরী কোভিশিল্ড নামের টিকাটি আসলে অক্সফোর্ড উদ্ভাবিত। অক্যফোর্ডের এই টিকা সব ধরণের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেই ইউকে, ইউরোপ এবং আমেরিকায় অনুমোদন পেয়েছে। ইউকে তে এই টিকাটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে এষ্ট্রাজেনেকা। তারাই দক্ষিন আফ্রিকা, ব্রাজিল এবং ভারতের ৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনঃউৎপাদন করছে। ভারতের সিরাম ইনষ্টিটিউট যা কিনা পৃথিবীর অন্যতম বড় টিকা উৎপাদনকারী – ভারত এবং দক্ষিন এশিয়ার জন্য এই টিকা উৎপাদনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত। সুতরাং বাংলাদেশে আসা টিকা অনুমোদনহীন এই কথা ধোপে টিকে না।

অনুমোদনহীন প্রমানের জন্য তারা ইদানিং নতুন পথ বের করেছে। টিকা নেয়ার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করলে একটি টিকা কার্ড ডাউনলোড করে প্রিন্ট করতে হয়। তাতে একটি সম্মতিপত্রে সাক্ষর করতে হয়। তাদের ভাষ্য এটি অনুমোদনহীন বলেই সরকার এই সম্মতিপত্র সাক্ষরসহ নিয়ে রাখছে যাতে কোন সমস্যা হলে দায় নিতে না হয়। একটু চিন্তা করলে আপনিও বুঝবেন এটি ও কুযুক্তি। বেশ আগে আব্বার দাঁতে সমস্যা হওয়ায় সেটি তুলে ফেলতে হয়েছিলো। তোলার আগে এনেস্থেশিয়া দিতে হয় (যা যে কোন অপারেশনের আগেই দিতে হয়)। দাঁত তোলার জন্য দেয়া হয় লোকাল এনেস্থেশিয়া যা কেবল দাঁত এবং সংলগ্ন অংশ সাময়িক চেতনাহীন করে। সে জন্যও কিন্তু ডাক্তার আব্বার কাছ থেকে সম্মতিপত্রে সাক্ষর নিয়েছিলো। তো টিকা নেয়ার সময় আপনাকেও সম্মতিপত্রে সাক্ষর করতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আপনার যদি এই সম্মতি দিতে আপত্তি থাকে তো আপনি সাক্ষর করবেন না, টিকাও নিবেন না। এটি সম্পূর্ন আপনার সিদ্ধান্ত।

টিকা নেয়ার জন্য আমি গত ২৯শে জানুয়ারী ২০২১ তারিখে surokkha.com.bd সাইটে রেজিষ্ট্রেশন করি। গত ৮ই ফেব্রুয়ারী ছিলো আমার টিকা দেয়ার ডেট। যথা সময়েই মোবাইল ফোনে এসএমএস পেয়েছিলাম। যথা সময়েই কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিয়ে আসি।

এখন কথা হলো – এই টিকার কি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে ? সব ঔষধেরই কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। তবে সেটি সবার ক্ষেত্রেই ঘটে এমনটি কিন্তু না। টিকা কেন্দ্রের একজন ডাক্তার সহজে বুঝানোর জন্য একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছিলে। জন্মের পর বাচ্চাদের বেশ কিছু টিকা দিতে হয় কয়েক সপ্তাহ / মাসের ব্যবধানে। তখন কিন্তু সব বাবা-মাই একটু উদ্বিগ্ন থাকেন বাচ্চার জ্বর আসবে কিনা বা ব্যথা হবে কিনা তা নিয়ে। টিকা নেয়ার পর জ্বর বা ব্যথা হওয়া কিন্তু খূবই স্বাভাবিক একটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। করোনার টিকা নিলেও এমনটি হতে পারে।

আমার পরিচিত যারা টিকা নিয়েছেন এখন পর্যন্ত তাদের কারও জ্বর হয়নি, তবে টিকা দেয়া জায়গায় ব্যথা আছে সবারই। আমার এক ডাক্তার কাজিনের ভাষ্য টিকা দেয়ার ২৪-৪৯ ঘন্টার মধ্যে জ্বর হতে পারে আর ব্যথা থাকতে পারে সপ্তাহ খানেক। উনি নিজেও আমেরিকায় মডার্নার তৈরী টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন এবং তার জ্বর এবং ব্যথা দুটোই ছিলো।

আমার ক্ষেত্রে সকালে টিকা নেয়ার পর রাতে জ্বর এসেছিলো। পরদিন সারাদিনই কেমন একটা জ্বর জ্বর ভাব ছিলো। টিকা নেয়ার ৪৮ ঘন্টা পার হওয়ার আগেই অবশ্য জ্বর পালিয়েছে। তবে টিকা দেয়ার স্থানে ব্যথা আছে, তবে সেখানে চাপ পরলেই কেবল ব্যথা লাগে।

আপনি যদি সচেতন একজন মানুষ হন, নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকেন তবে নিশ্চিন্তে টিকা নিয়ে নিন। মনে রাখবে টিকা নেয়ার পরও কিন্তু নিরাপদ দূর্ত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখবেন। মনে রাখবে এই টিকা এখন পর্যন্ত ৭০% কার্যকর প্রমানিত।

এই টিকা কারা নিতে পারবেন, কারা পারবেন না এই নিয়ে অনেকেই চিন্তায় আছেন। তাদের জন্য ফেসবুকে পাওয়া একজনের পোষ্ট শেয়ার করছি।

“কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিন কারা নিতে পারবেন, কারা পারবেননা, এ নিয়ে অনেকেই ধন্দে আছেন। আপনারা সকলেই খুব ভাল করে জানেন কোভিড-১৯ রোগটি সাধারনত বয়স্ক ও কো-মরবিড দের ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারন করে এবং ৮০ শতাংশ মানুষ উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গযক্ত হয়ে থাকেন। ফলে ভ্যাক্সিনটির টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে মূলত বয়স্ক ও কোমর্বিডরা।

যারা ভ্যক্সিন নিতে পারবেনঃ
যাদের হার্ট , লিভার, কিডনীতে রোগ আছে
এজমা আক্রান্ত রোগী
ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী
ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত (যাদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ আছে, তারা নিয়ন্ত্রনের পর ভ্যাক্সিন দিতে পারবেন।)
যারা রোগপ্রতিরোধ কমে যায় এমন ঔষধ সেবন করেন।
যারা কেমোথেরাপী নিচ্ছেন
যারা কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছেন, আক্রান্ত হওয়ার ৬ সপ্তাহ পরে ভ্যাক্সিন নিতে পারবেন
 
যারা ভ্যক্সিন নিতে পারবেন নাঃ
যাদের বয়স ১৮ বছরের নীচে
গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা। সিডিসি মতে, দুগ্ধদানকারী মা যাদের কোভিড১৯ রোগীর সংস্পর্শে নিয়মিত আসতে হয় তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভ্যাক্সিন নিতে পারবেন। উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন গর্ভবতী নারী এ বিষয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।
 
অনেকেই জানতে চান, যাদের এলার্জি আছে, তারা ভ্যাক্সিন নিতে পারবেন কি না? একেকজন মানুষ একেকটি বস্তুতে এলার্জিক। কারো খাবারে, কারো কোন নির্দিষ্ট ঔষধে, কারো ধুলাবালিতে কারো বা ঠান্ডায়। তাই ভ্যাক্সিনে এলার্জি আছে কিনা তা প্রথম ডোজ দেয়ার আগে বোঝা সম্ভব নয়। যে কোন এলার্জেনের ক্ষেত্রে প্রথম এক্সপোজারে মৃদু উপসর্গ হয়, যেমন চুলকানি, র্যাশ ইত্যাদি। ভ্যাক্সিনের প্রথম ডোজে এমন উপসর্গ হলে পরবর্তী ডোজের ব্যপারে দয়া করা ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।
 
অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিনে জানামতে কোন পরিচিত এলার্জেন নেই। তবে ফাইজারে পলি ইথিলিন গ্লাইকল নামে একটি এলার্জেন আছে। তাই যাদের ফাইজারের ভ্যাক্সিনে এলার্জি আছে তারা অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিন নিতে পারেন।
 
ভ্যাক্সিন নিয়ে ভীত হওয়ার কিছু নাই।”
 
ডাঃ নুসরাত সুলতানা, সহকারী অধ্যাপক, ভাইরোলজী বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ভাল থাকুন। নিরাপদে থাকুন।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।