গ্রামের বিয়ে এবং রূপবান

আমার জন্ম এবং বেড়ে উঠা মূলত ঢাকাতেই। যদিও আব্বার চাকরির সুবাদে চিটাগাং এবং ময়মনসিংহেও থাকতে হয়েছে কয়েক বছর। আমার প্রথম গ্রাম দর্শন ১৯৭৪ সালে। গ্রীষ্মের ছুটিতে আব্বা সেবার সবাইকে নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেসময় টাঙ্গাইল যেতে হতো ময়মনসিংহ ঘুরে। খূব সম্ভবত কালিহাতি নেমে আমরা নৌকায় চড়ে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেবার কিছুটা বন্যা হয়েছিলো। বন্যার সময় প্রতিটি বাড়ি মনে হচ্ছিলো এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

সেবারের গ্রাম পরিদর্শনের কথা খূব একটা মনে নেই। পরবর্তীতে গ্রামে যাই ১৯৭৬ বা ১৯৭৭ সালে, কোন এক খালা ফফুর বিয়ে উপলক্ষে। সেটাই ছিলো গ্রামের বিয়ে দেখার প্রথম সূযোগ। এরপর আরো বার দুই গ্রামের বিয়ে দেখেছি। যতো দিন যাচ্ছে শহরের বিয়ে আর গ্রামের বিয়ের পার্থক্য ঘুচে যাচ্ছে।

গ্রামের বিয়ে তখন পুরাই অন্যরকম। শহরে জন্ম হওয়া এবং বেড়ে উঠা যাদের তারা শহরের বিয়ের সাথে একেবারেই মিলাতে পারবেন না। এখন অবশ্য শহর আর গ্রামের বিয়ের মধ্যে খূব বেশী পার্থক্য নাই।

প্রথম পার্থক্য ছিলো গায়ে হলুদ নামে আলাদা কোন অনুষ্ঠান ছিলো না। তবে বিয়ের দিন হলুদ দিয়ে জামাই / বৌকে বাড়ির মহিলারা গোসল করাতো। আর সেই গোসল করাতে গিয়ে পানি দিয়ে কাদা বানিয়ে একজন আরেকজনকে সেখানে ফেলে ইচ্ছে মতো কাদা মাখামাখি করতো।

এরপর মনে পরে মাইক ভাড়া করে আনার কথা। তখন ছিলো এলপি রেকর্ডের যুগ। মাইকওয়ালা সারারাত ধরে প্রাগৈতিহাসিক আমলের সিনেমার গান বাজাতো।

তবে আমি বেশী অবাক হয়েছিলাম খাওয়ার মেনু দেখে। কোন বিরিয়ানি-পোলাও-কোর্মা-রোষ্ট নাই। সিম্পল ভাত আর গরুর মাংস, সাথে ঘন ডাল। শেষে মনে হয় মিষ্টি ছিলো (রসগোল্লা / চমচম)। বিরিয়ানি / পোলাও নাই কেন শুনে আমার এক চাচা বেশ হেসেছিলেন। পরে বলেছিলেন গ্রামের মানুষ আসলে এসব খাবারে খূব বেশী অভ্যস্ত না। তারা পেট পুরে ভাত-মাংস খেতে পেলেই বেশী খুশী হয়।

সন্ধ্যায় কনে বিদায়ের সময় কনে পক্ষ আর বর পক্ষের মধ্যে একটা ঘাপলা হয়ে গেলো। বরপক্ষ একটা টিভি চেয়েছিলো। টিভি আনাও হয়েছিলো। কিন্তু সেটা ছিলো ইলেক্ট্রিসিটিতে চলা টিভি। সে সময় আমাদের গ্রামে কিংবা বরের গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না। বরের বাবা তাই রীতিমতো অসন্তুষ্ট। তার কথা এখনও আমার মনে আছে। তিনি বলছিলেন “আপনাদের একটু বিবেচনা বোধ নাই। এই টিভি নিয়ে তো এখন সাজায় রাখতে হবে। ” পরে অবশ্য কোন একভাবে ব্যাপারটা মিটমাট হয়েছিলো।

রাতে মাইকওয়ালা যেসব গান বাজাতো তা আগে কোনদিনই শুনি নাই। এক বড় মা ছিলো আমাদের, কিছুক্ষণ পর পর এসে বলতেন অমুক বই (সিনেমা) এর গান বাজাও। অমুক বই এর মধ্যে অন্যতম ছিলো রুপবান। আজ ইউটিউবে খোজ নিয়ে গানগুলো পেলাম। এখনকার প্রজন্ম হয়তো আবদুল আলিম বা নীনা হামিদের নাম খূব একটা শুনে নাই। শুনে দেখেন কেমন লাগে।

ছবি : উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।