ঘটনা দূর্ঘটনা

ঘটনা প্রাগৈতিহাসিক আমলের, মানে সেই ১৯৮৯ সালের। সদ্য ষ্টকহোম গিয়েছি। যাই দেখি তাই ভাল লাগে। কি সুন্দর ছিমছাম, সব দিকেই কি চমৎকার নিয়ম-শৃঙ্খলা। রাস্তা-ঘাটে সাই সাই করে গাড়ী চলছে হাজারে হাজার। কেউ নিয়ম ভাঙ্গছে না। কোন ট্রাফিক পুলিশ নাই, তারপরও সবাই সিগনাল মানছে। এমন কি রাতে যখন গাড়ি কম থাকে বা থাকেই না, তখনও সবাই নিয়ম মানে।
 
মাঝে মধ্যে আমারও শখ হয় সুইডিশ পাবলিক কেমন নিয়ম মানে তা পরখ করার। দেখা গেলো প্রচুর গাড়ী চলছে রাস্তায়, আমি বেরসিক জেব্রা ক্রসিং এ গিয়ে টিপে দিলাম সুইচ – রাস্তা পার হবো। বাজা শুরু হলো ঘন্টা, দাড়িয়ে গেলো সব গাড়ী, আমিও হেলতে দুলতে পার হয়ে গেলাম। পার হওয়া মাত্রই চলা শুরু হলো না, ঘন্টা থামলো তারপর চলা শুরু হলো গাড়ী। একবার কোথায় জানি যাবো, একটু দেরি হয়ে গেছে। বাস ষ্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে দেখি রাস্তার অপর পাশে বাস চলে আসছে, লোকজন বাসে উঠে গেছে। জেব্রা ক্রসিং এর ঘন্টাটা জাষ্ট থামলো। আমি আবার টিপে দিলাম সুইচ, সাথে হেই হেই বলে আর হাত নেড়ে বাস ড্রাইভারের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করলাম। এই বাস মিস হলে কমপক্ষে আধ ঘন্টা পরে আবার বাস। মনে হয় ৩/৪টা গাড়ী পার হয়েছিলো, ঘন্টা বাজা শুরু হতেই গাড়ী সব থেমে গেলো। বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমিও দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গিয়ে বাসে উঠলাম।
 

একদিন বাংলাদেশ দূতাবাসের গাড়ীতে চড়ে কোথাও যাচ্ছি। গাড়ী চালাচ্ছিলো মরিস। মরিসের আদি বাড়ি হাঙ্গেরী। ছিলো বিমান বাহিনীর ফাইটার প্লেনের পাইলট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরী পূর্ব ব্লকে চলে গেলো, মরিস কোন একসময় পালিয়ে চলে আসে সুইডেন। সুইডিশ মেয়ে বিয়ে করে সুইডেনেই রয়ে যায়। যেহেতু প্লেনের পাইলট ছিলো সেটাকেই আবার পেশা হিসেবে নেয়। লাইসেন্স পায় কমার্শিয়াল প্লেন চালানোর। ভালই চলছিলো জীবন। বহু দেশে গেছে প্লেন নিয়ে। একসময় হার্টে সমস্যা ধরা পড়লো, ম্যাসিভ হার্ট এটাকও হলো। সুস্থ্য হওয়ার পর মেডিকেল বোর্ড ঘোষণা করলো ‘আনফিট টু ফ্লাই’। এপর তো আর সময় কাটে না। বাংলাদেশ দূতাবাস সেই সময় একজন শোফার চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলো, মরিস গিয়ে হাজির হলো ইন্টারভিউ দিতে। তার সিভি দেখে প্রথম প্রশ্ন করা হলো প্লেন চালানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে গাড়ী চালানোর চাকরি তার কেন দরকার ? বেতনও তো পাইলটের ধারে কাছের না।মরিস নাকি বলেছিলো তার টাকার দরকার নাই, জাষ্ট সময় কাটানো দরকার। টাকা তার যথেষ্ঠই আছে। চাকরি হয়ে গেলো। মরিসের সাথে কোথাও গেলে ব্যাপক আলাপ আলোচনা হতো। সে অনর্গল কথা বলতে পারে আর আমি একজন ভাল শ্রোতা। তো সেদিন কথা হচ্ছিলো এই নিয়ম কানুন মানা নিয়ে। আমি বলছিলাম যে তোমার দেশের মানুষ কি ভাল, নিয়ম কানুন মেনে চলে। রাস্তা ঘাটে বা অন্য কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নাই। মরিস কথার মধ্যে হঠাৎ করে হর্ণ বাজালো একবার। ষ্টকহোমের রাস্তাতে হর্ণ এর শব্দ শোনা চাট্টিখানি কথা না, যদিও গাড়ী চলতেছে হাজারে হাজার। আমি তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মরিসের দিকে তাকাতে সে বললো পাশের লেনের গাড়ী সিগনাল দিয়েই তার লেনে চলে আসছে। তাই একটু বকে দিলো। আরেকদিন হর্ণ বাজানোর পরে কাকে জানি হাত নাড়লো। আমি মনে করেছিলাম পরিচিত হয়তো। বললো ঐ গাড়ীর মেয়েটা খূব সুন্দর ছিলো, খেয়াল করো নাই ?

তো সেদিনের নিয়ম কানুন মানা নিয়ে আমাদের আলোচনা চলতে থাকলো। মরিস বললো দুনিয়ার কোন গাড়ী চালকই নিয়ম মানতে চায় না। ড্রাইভিং সিটে বসলে মনে করে উঠলাম এফ ১৬ এর ককপিটে। তাকে তার এফ ১৬ থেকে মাটির দূনিয়ায় নামিয়ে আনতে পারে কঠোর আইন আর জরিমানার বোঝা। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলো এই ভাবে যে একই টাইপের ২/৩টা টিকেট পেলে তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স যদি বাতিল হওয়ার পথে থাকে তুমি আইন মেনে চলতে বাধ্য। কারণ সবসময় পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে পোষায় না। আবার কোন কোন চাকরিতে শর্তই দেয়া থাকে নিজের গাড়ী থাকা লাগবে। গাড়ী আছে, অথচ ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই সেটা তো হয়ে গেলো অনেকটা কাঁঠালের আমস্বত্বের মতো ব্যাপার। আবার লাইসেন্স বাতিল হলে নতুন করে লাইসেন্স পেতে আরো বেশী ঝামেলা। তাই কেউ লাইসেন্স হারাতে চায় না, আইনে মেনেই চলে নিয়মিত। আবার বড় অংকের জরিমানা তো আছেই। একবার জরিমানা হলে একই আইন আবার ভঙ্গ করলে নাকি জরিমানার পরিমান বেড়ে যায়। সেই সাথে বাড়ে লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি। যে লোক মিনিমাম ওয়েজে চলে তার যদি মাসে ৩/৪ বার জরিমানা দিতে হয় তো পকেট নাকি খালি হয়ে যাবে। সুতরাং তুমি কেষ্টু-বিষ্টু যাই হও, ট্রাফিক আইন তোমাকে মানতেই হবে। বিন্দু মাত্র ছাড় নাই।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতেও কঠোর সাধনা করতে হয়। প্রথমত বিধিবদ্ধ কোন ড্রাইভিং স্কুল থেকে ড্রাইভিং শিখতে হবে। ওস্তাদের কাছে শিখে সোজা লাইসেন্সের লাইনে দাড়ানোর সূযোগ নাই। অনেকেই প্রাথমিক ড্রাইভিং হয়তো শিখে পরিবারের কারো কাছে। এরপর ড্রাইভিং স্কুলে যেতে হয়। ইন্সট্রাকটর সন্তুষ্ট হলেই কেবল লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। এরপর থিউরিটিক্যাল এবং প্র্যাকটিক্যাল টেষ্ট। দুইটাতেই পাশ করলে তারপর লাইসেন্স। কারো কারো একাধিকবার পরীক্ষা দেয়া লাগে, কেউ একবারেই উৎরে যায়।
আমাদের দেশে …

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *