ডাব্বাওয়ালা

কিছুদিন আগে একটা খবর চোখে পড়েছিলো যে ভারতের মুম্বাই এর ডাব্বাওয়ালারা এই করোনাকালে ব্যাপক সমস্যায় আছেন। অনেকেই বেঁচে থাকার জন্য পেশা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন। গতকাল বিবিসি’র এক ডকুমেন্টারি দেখতে গিয়ে এই ডাব্বাওয়ালাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আবার কিছুটা জানলাম। বিবিমি’র এই ডকুমেন্টারি ছিলো মূলত মুম্বাই রেলওয়ে নিয়ে। তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতে প্রথম রেলওয়ে ট্রেন চালনা করা হয়েছিলো ১৮৫৩ সালের ১৬ই এপ্রিল বোরি বন্দর থেকে থানে পর্যন্ত। সেই বোরি বন্দরের বর্তমান নাম ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাল বা সংক্ষেপে সিএসটি। আর ১৮৯০ সালে মহাদেব হাভাজি বাচ্চে নামে একজন পারসি ব্যাংকারের হাত ধরে শুরু হয়েছিলো এই ডাব্বাওয়ালা সার্ভিস। আর এখন এই সময় মুম্বাই রেলওয়ে আর ডাব্বাওয়ালা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। দুপুরের দিকে যেসব ট্রেন চলে তাতে ডাব্বাওয়ালাদের জন্য আলাদা কোচও নাকি থাকে।

‘প্রচুর অভিবাসী যখন বিভিন্ন সম্প্রদায় থেকে বিশাল এই শহরে এসে কাজে নিযুক্ত হলেন, তখন ফাস্ট ফুডের দোকান বা অফিস ক্যান্টিনও সেভাবে চালু ছিল না। সকালে বাড়ি থেকে খাবার খেয়ে বের হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল-সন্ধ্যা অবধি না খেয়েই থাকতে হতো অনেককে। দুপুরে অফিসে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবে কাজেও ব্যাঘাত ঘটছিল।

এদিকে গ্রাম থেকে কৃষিকাজ করা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষরাও কাজের সন্ধানে ঘুরছিল। কেউ কেউ হয়তো ব্রিটিশ বাড়িগুলোতে কাজ পেত, কিন্তু শারীরিক পরিশ্রমের তুলনার যা পেত তার মূল্য ছিল খুবই কম। খাবার না আনতে পারা এবং কাজ খুঁজে না পাওয়া এই দুই দলকে একত্র করেন মহাদেব। সারা দিনে হাজারো কাজের ভিড়ে মানুষের নির্ভাবনায় তৃপ্তিভরে খাবারের জন্য ১০০ জন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ‘ডাব্বাওয়ালা’র। তারা সবাই বাড়ি থেকে খাবার এনে অফিসে অফিসে পৌঁছে দিতেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ডাব্বাওয়ালাকে। সেদিনের সেই ১০০ ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা আজ পাঁচ হাজারেরও বেশি। পৌঁছানো খাবারের সংখ্যা দুই লাখের বেশি। ১৯৩০ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে মহাদেব এই ডাব্বাওয়ালাদের একত্রীকরণের চেষ্টা করেন। পরে ১৯৫৬ সালে ‘নূতন মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ারস ট্রাস্ট’ নামে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হিসেবে মর্যাদা পায়। ১৯৬৮ সালে নথিভুক্ত হয় ‘মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ারস অ্যাসোসিয়েশন’।’ তথ্যসূত্র লিংক

বিশাল শহর মুম্বাই এর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত যেতে রেলওয়ে হলো সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং জনপ্রিয় মাধ্যম। সকালের রাশ আওয়ারে তাই গাদাগাদি করে এসব ট্রেনে চড়ে কাজে যান অসংখ্য লোক। সেসময় হাতে করে আলাদা টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার বহন করা বেশ দুরুহ কাজ। আবার সকালে নিয়ে আসা খাবার দূপুরে খেতে গেলে ভালো লাগে না। আর তাই ঘরে তৈরি খাবার অফিসে পৌছে দেয়ার এই কাজটি করে থাকেন এই ডাব্বাওয়ালারা। পুরো মুম্বাই এ প্রায় হাজার পাঁচেক ডাব্বাওয়ালা আছেন। অল্প শিক্ষিত এই সব ডাব্বাওয়ালা হাজার হাজার টিফিন বক্স পোছে দিচ্ছেন নির্দিষ্ট গন্তবে প্রায় নির্ভুল ভাবে। তবে তাদেরও ভুল হয় বৈকি তবে সেই ভুলের পরিমান অতি নগন্য। ভুল মানে একজনের খাবার অন্যজনের কাছে পৌছে দেয়া।

‘এত বড় কাজে কখনো কি ভুল হয় না ডাব্বাওয়ালাদের? অবশ্যই হয়! তবে সে সংখ্যা আনুপাতিক হারে খুবই কম। হিসাবে প্রতি মাসে হয়তো একটা ভুল হয়। অর্থাৎ একজনের সঙ্গে অন্যজনের টিফিনবক্সের বদল হয়ে যায়। কাজটা এত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় দেখে যে কেউ বিস্মিত হবেন। বিস্ময়ের চূড়ান্ত মাত্রা সঙ্গে নিয়েই ডাব্বাওয়ালাদের কাজ নিজ চোখে দেখতে তাদের নিয়ে গবেষণা করেছিল হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। ২০১০ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল তাদের দক্ষতাকে ‘সিক্স সিগমা’ রেটিং দেয়। এর অর্থ হচ্ছে প্রতি এক মিলিয়ন আদান-প্রদানে তাদের ভুলের সংখ্যা ৩ দশমিক ৪-এরও কম। প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ গ্রাহককে খাবার পৌঁছে দেওয়া এই সার্ভিসে খাবার পৌঁছানোতে দেরি অথবা বক্স হারানোর সংখ্যা বছরে সব মিলিয়ে মাত্র ৪০০। ফেডএক্সে তাদের নিয়ে একটি রিপোর্টও করা হয়। বিশ্বখ্যাত ডেলিভারি কোম্পানি আমাজন পর্যন্ত ডাব্বাওয়ালাদের কাজ সম্পর্কে জানতে ছুটে এসেছিল মুম্বাইয়ে। তাদের সঙ্গে একটা পুরো দিন কাটিয়েছেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী রিচার্ড ব্রানসনও।’ তথ্যসূত্র লিংক
 
বিবিসি’র ডকুমেন্টারিতে দেখানো হলো প্রতিটি টিফিন বক্সের নিচে তারা কিছু সংকেত লিখে রাখে। একটি সংকেত দিয়ে বুঝানো হয় কোন জায়গা থেকে টিফিন বক্সটি সংগ্রহ করা হয়েছে। আরেকটি সংকেত দিয়ে দেখানো হয় কে এটি সংগ্রহ করেছেন। আরেকটি সংকেত দিয়ে দেখানো হয় শেষ ষ্টেশনটি কোনটি এবং সবশেষ সংকেতে থাকে কোন এলাকায় কোন বিল্ডিং এর কয়তলায় টিফিন বক্সটি পৌছে দিতে হবে। আবার একই সংকেত অনুসরন করে সেটি আবার পৌছে যাবে আদি ঠিকানায়। এই যাত্রাপথে একটি টিফিন বক্স ৪/৫ বার হাত বদল হতে পারে।

মুম্বাই শহরের লোকজন এই ডাব্বাওয়ালাদের বেশ সম্মানের চোখেই দেখে থাকেন। প্রয়োজনে তাদের জন্য পথও ছেড়ে দেন তারা। কারণ তারা জানেন তাদের কোন পরিচিতজনই হয়তো দুপুরের খাবারের জন্য হয়তো এই ডাব্বাওয়ার উপর নির্ভরশীল।

ভাল থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।

বিবিসি’র ডকুমেন্টারি
বিবিসি ৪ এর ডকুমেন্টারি
ডাব্বাওয়ালা ১
ডাব্বাওয়ালা ২
বিবিসি’র ফটোষ্টোরি
বিডিনিউজ২৪
দেশ রুপান্ত এর রিপোর্ট
ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।