দরু নানী

ছোট বেলার বেশ কিছু ঘটনা এখনও দিব্বি মনে করতে পারি। হয়তো ঘটনাগুলো মনে ব্যাপক দাগ কেটেছিলো। আজ সেরকমই কিছু ঘটনা মনের মধ্যে ঘুরছিলো। প্রথম ঘটনা খূব সম্ভবত ১৯৬৮/৬৯ সালের। আব্বা তখন লন্ডনে, কোন একটি কোর্স করার জন্য। আমরা, মানে আম্মা, বড় বোন, ছোট ভাই আর আমি তখন বড় চাচার বুয়েটের বাসায়। 

একদিন রাতে শুনলাম আব্বা আমার জন্য একটা খেলনা এরোপ্লেন পাঠিয়েছে হায়দার নানার মাধ্যমে। হায়দার নানা তখন পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের পাইলট, নিয়মিতই ঢাকা-লন্ডন প্লেন নিয়ে যান। লন্ডনে আব্বার সাথে বলতে গেলে নিয়মিত দেখা কিংবা কথা হয়। তখন টেলিফোন যোগাযোগ তেমন হতো না, যোগসূত্র ছিলো চিঠি আর এই হায়দার নানা।

পরদিন আমি রীতিমতো অস্থির, কখন আসবে আমার প্লেন। কয়টার সময় ঠিক মনে নেই, তবে দূপুরের আগেই নীল ঝলমলে শাড়ী পরা এক মহিলা আর সাথে ১০/১২ বছরের এক ছেলে এসে হাজির। ছেলের হাতে আমার সেই প্লেনের বক্স। জানলাম মহিলা আমার দরু নানী আর ছেলে মামা (কোন মামা সেটা আর মনে নেই)। দরু নানীর আসল নাম দরিয়া এ নুর, আমি এই নাম জেনেছি অনেক পরে। সবাই তাকে দরু বলেই ডাকে, আমরাও জানি তিনি আমাদের দরু নানী। নানীর বয়স আমাদের মা-খালাদের চাইতে খূব বেশী ছিলো না। খূব সম্ভবত তিনি আমার বড় চাচী / খালার সমসাময়িক। দূ’জন দূ’জনকে নাম ধরেই ডাকতেন। দরু নানী অনর্গল কথা বলতে পারতেন এবং বেশ উচ্চস্বরেই। আমরা যারা নাতি-নাতনী ছিলাম দরু নানী আর হায়দার নানা বেশ আদর করতেন। দরু নানী নাতীদের সম্বোধন করতেন প্রিন্স আর নাতনীদের প্রিন্সেস। অনেক বড় হয়ে একবার কোথায় জানি দেখা হলো, ঠিক চিনতে পারেন নাই। আমি সালাম দেয়ার সাথে সাথেই থুতনীতে আঙ্গুল ছুইয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এই প্রিন্স, তুমি জানি কার ছেলে ?”। আব্বা-আম্মার ডাক নাম বলতেই কাছে টেনে নিলেন আর সেকি উচ্ছাস তার। আব্বা-আম্মার খোঁজ নিলেন, কি করি এসব।

স্বাধীনতা সংগ্রামের পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গঠিত হলে হায়দার নানা সেখানে জয়েন করেন। কিন্তু দূঃখজনক হলো ভারত থেকে পাওয়া ডিসি ৩ এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সময়ই ফেব্রুয়ারী ১০, ১৯৭২ সেটি বিধ্বস্ত হয়ে হায়দার নানা আরো কয়েকজনের সাথে নিহত হন। তার পুরো নাম ছিলো (ক্যাপ্টেন) নাসিম হায়দার। অল্প যে কয়বার তার সাথে দেখা হয়েছে মজার সব কান্ড করে আমাদের হাসিয়েছেন। আব্বার কাছে শুনেছি ছোটবেলায় অসম্ভব ডানপিটে ছিলেন। সাইকেল নিয়ে মাইলের পর মাইল চলে যেতেন ঘুরতে। আব্বাকেও নাকি কয়েকবার সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বসিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছেন।

আমার সাথে হায়দার নানা’র দেখা হয়েছে সাকুল্লে ২/৩বার, তাও বড় চাচার বাসায়। একবার আসলেন, এসেই দেখা হলো নানু’র (আম্মার মা) সাথে। সে তো তার বোন, আপন বোন না অবশ্য। সোজা নানু’কে কোলে করে এ ঘরে যান, ও ঘরে যান। নানু তো এদিকে সমানে বকা দিচ্ছেন নানা’কে ‘এই হায়দার নামা শিগগির, কি আরম্ভ করলি’, কে শুনে কার কথা। এদিকে আমরা ছোটরা তো নানার কান্ড দেখে হেসে লুটোপুটি। আরেকবার ঘরে ঢুকে আমার ছোটভাইকে কোলে নিলেন বোনের কাছ থেকে। নতুন লোক দেখে রনি কান্না শুরু করেছে। নানা জিজ্ঞেস করলেন ‘মিছরি নাই?’, বোন মিছরির কৌটা বের করে দিলে সেটা থেকে বড় একটা টুকরো নিলেন। বোনকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘খায় তো?’ বলে মিছরির টুকরা ধরলেন ছোট ভাই এর মুখের সামনে। বোন তো চিৎকার ‘এতো বড়োটা তো খেতে পারবে না।’ ‘হুম’ বলে কি জানি একটু ভাবলেন। তারপর নিজেই  কুটুর মুটুর করে চাবানো শুরু করলেন মিছরি। এরপর ছোট একটা টুকরো মুখ থেকে বের করে ছোটভাই এর মুখে চালান করে দিলেন। ‘আম্মা, নানা দেখো কি করতেছে’ বলেই বোন ছুটে গেলো আম্মাকে খবর দিতে আর আমি তো হাসতে হাসতে শেষ।

নানা মারা যাওয়ার পর আব্বা হাসপাতালে গিয়েছিলেন পরদিন সকালে রেডিও’তে খবর শুনে। ফিরে এসে বলেছিলেন লাশ চেনার আর তেমন কোন উপায় ছিলো না। হাটু থেকে উপরের দিকে সমস্ত দেহই ভেঙ্গে-চুড়ে গিয়েছিলো। হাসপাতালের লোক আইডেন্টিফাই করতে পেরেছেন কিনা জিজ্ঞেস করেছিলো। আব্বা বলেছিলেন নানার সরু গোঁফ দেখে তাকে চিনেছিলেন। তার সহকর্মীরাও একমত হয়েছিলেন। দরু নানী নাকি নানার লাশ দেখেন নাই, সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন দেখতে। বিয়ের আগে তারা ছিলেন কাজিন, বলা চলে অনেকটা বাল্য প্রেম থেকেই বিয়ে। নানীর কথা হলো ছোটবেলা থেকে যে চেহারা তিনি মনে রেখেছেন সেটাই তিনি মনে রাখতে চান, কোন দুমড়ানো মোচড়ানো লাশের চেহারা না।

নানীকে কোনদিন মনমরা দেখি নাই। হাসিখুশী প্রানবস্ত একজন মানুষ। হাসি আর অনর্গল কথা বলা একজন মানুষ। কখনই বিধবার পোষাকে দেখি নাই। সবসময়ই রঙ্গীন শাড়ী পরা, সেজেগুজে থাকা নানীকেই দেখেছি। বেশ কয়েকবছর হলো নানীর সাথে দেখা হয় নাই। শুনেছি একেবারে নিভৃতাচারী হয়ে গিয়েছেন। খূব কাছের মানুষ ছাড়া দেখা করেন না। মাঝে মধ্যে কবিতা লিখেন। এই ভাবেই নাকি চলছে তার জীবন।

গত সপ্তাহে দরু নানী আমাদের সবাই’কে ছেড়ে চলে গেছেন।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।