ষ্টকহোম ডায়েরী (১৭)

উভে


ষ্টকহোমে স্বল্পকালীন প্রবাস জীবনে ষ্টকহোমের বাইরে খূব বেশী যাওয়া হয়নি। এক কোরবানীর ঈদে গিয়েছিলাম উপসালা, এক আত্মীয়ের বাসায়। ২ এমিউজমেন্ট পার্কে যাওয়া হয়েছে, তবে কোনটারই নাম মনে নেই। একবার গিয়েছিলাম পূরো পরিবারের সাথে, আরেকবার অন্য আরেকটি পার্কে উভে’র সাথে। সেটি অবশ্য ছিলো বিশেষ ধরণের পার্ক, সুইডেনের অতীত কালের অনেক কিছুই সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই বলে সেগুলো ঠিক জাদূঘরের মতো না। সুইডেন এবং জনগণের লাইফষ্টাইল সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে। সেই পুরাতন সুইডেনের সাথে বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার বেশ কিছু মিল আছে। আমি খূব অবাক হয়েছিলাম ওদের গ্রামীণ ডাক্তারখানা দেখে। অনেকটাই আমাদের কবিরাজী চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিলো তখন। ঘরের মধ্যে বিভিন্ন ঔষধী গাছ-গাছড়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সাথে কোনটা কি তার বর্ণনা। যথারীতি দূ’জন কবিরাজ, মানে ডাক্তারকেও দেখা গেলো ঔষধ তৈরী করছে বা কিছু পরীক্ষা করছে। তবে তাদের যন্ত্রপাতি কিন্তু খূব বেশী পুরাতন না। যেমন – স্কুল কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাবে আমরা যেসব  কাঁচের জিনিস ব্যবহার করতাম সেসব দেখা গেলো সেখানেও আছে। মাইক্রোস্কোপ আছে, বর্তমান মাইক্রোস্কোপের মতোই। তবে কিছুটা ভিন্ন।

আরেক জায়গায় দেখলাম ছোট একটি গীর্জা, সেখানে একজন পাদ্রীও আছেন। আমি অবশ্য মনে করেছিলাম হয়তো দেখানোর জন্য তাকে রাখা হয়েছে। উভে তার সাথে আলাপ করে এসে জানালো ভদ্রলোক আসলেই একজন পাদ্রী।

গির্জা
উভে কথা বলছে গির্জার পাদ্রীর সাথে

এক জায়গায় দেখা গেলো বাক্স মতো একটা জিনিস, তাকে উঠার জন্য আবার কাঠের সিড়ি আছে। আগেকার দিনে ক্ষেতের ফসল সংরক্ষণ করা হতো। উচুতে রাখার কারণ বন্য জন্তু জানোয়ার যাতে সহজে নাগাল না পায়। 

গোলা
ফসলের গোলার সামনে আমি

আরেক জায়গায় দেখা গেলো একজন কাঠমিস্ত্র একটি কাঠের চেয়ার তৈরী করে তাতে কুশন লাগাচ্ছেন। বর্তমান সুইডেনে অবশ্য কোন ফার্নিচার হাতে তৈরী হয় না। নক ডাউন ফার্নিচার বেশী জনপ্রিয়। সুইডেনের বিখ্যাত ফার্নিচার রিটেইলার ইকেয়া তো জগত বিখ্যাত।

কাঠমিস্ত্রী
কাঠমিস্ত্রী কাজে ব্যস্ত

মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। গ্রীষ্মকালেই বড়চাচা একদিন জানালেন পরদিন আমরা সবাই যাবো একটু রিমোট এরিয়ায়, ষ্ট্রবেরী তুলতে। ষ্ট্রবেরী ফ্লেভার দেয়া আইসক্রীম তো চিনি, কিন্তু কথা হলো ষ্ট্রবেরী ফল তো আর চিনি না। জানলাম ষ্ট্রবেরী ফলের সাইজ অনেকটা আমাদের লিচুর মতো। তাহলে গাছ কতো বড় ? চাচা হাসতে হাসতেই বললেন একবারে গিয়েই দেখো। পরদিন রেডি হওয়ার পর দেখি দুই পিচ্চি আর তাদের মায়েরা ছোট-বড় ৩/৪টি বালতি সহ আরো কি কি যেন নিয়ে গাড়ীতে তুললো। একসময় জায়গা মতো পৌছে গেলাম। বিশাল মাঠ, মাঝে মধ্যে কিছু গাছ। আর পুরো মাঠ জুড়ে টমেটো গাছের মতো ছোট ছোট গাছ। এগুলোই নাকি সেই ষ্ট্রবেরী গাছ। সিনেমায় দেখা ফার্ম হাউজের মতো বিল্ডিং ও চোখে পড়লো।  আমরা গিয়ে ছোট আরেকটা ঘরে উঠলাম। সেখান থেকে একজন গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন ক্ষেতের একটি নির্দিষ্ট অংশে। তখন খেয়াল করলাম পুরো ক্ষেত / মাঠটি এরকম ছোট ছোট আয়তাকার অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশের আলাদা আলাদা নাম্বার আছে। আমরা আমাদের অংশে পৌছাতেই বাচ্চারা অতি উৎসাহে ষ্ট্রবেরী তোলা শুরু করলো। গাইড জানিয়ে দিলো ক্ষেতে বসে আমরা যত খুশী ষ্ট্রবেরী খেতে পারি বিনা পয়সায়, কিন্তু বাসায় নিতে চাইলেই কেজি প্রতি দাম দিতে হবে। দেখা গেলো শুরুতে সবাই গাছ পাঁকা ষ্ট্রবেরী খেতেই ঊৎসাহী। স্বীকার করতেই হবে একদম পাঁকা পরিপুষ্ট ষ্ট্রবেরী কিন্তু অসাধারণ মিষ্টি। তবে দেশী কোন ফলের স্বাদের সঙ্গে মনে হয় তুলনা করা যাবে না। পাঁকা একটি ষ্ট্রবেরী জিহ্বা আর তালুন মাঝে নিয়ে চাপ দিলে ফেটে গিয়ে যে রস বের হয় তা ছিলো অপার্থিব। সেবার অনেক ষ্ট্রবেরী খাওয়ার পর যতগুলো বালতি নেয়া হয়েছিলো সবগুলো ভরে ষ্ট্রবেরী নিয়ে আসা হয়েছিলো ওজন করে। প্রতি বছরই তারা এই ষ্ট্রবেরী চাষ করে, সবই নাকি যন্ত্র দিয়ে। কেবল ফল তোলার সময় হলে লোক দরকার। কিন্তু ন্যুনতম মজুরী দিয়ে লোক রেখে ফল তুলতে হলে বিশাল ক্ষতি হবে। তাই তারা ফল তোলার সিজনে এমনভাবে ফল তোলার ব্যবস্থা করে। আমাদের আশে পাশে আরো অনেক পরিবার এরকম ফল তুলছিলো। ষ্ট্রবেরী ফলের সাথে সেবার বেশ কিছু মুরগীর ডিমও কিনে আনা হয়েছিলো। আমরা দেশে যেমন মুরগী পালি সেরকম ভাবে পালা মুরগীর ডিম।

গ্রামীণ ডাক্তারখানা
গ্রামীন ডাক্তারখানায় ঔষধী গাছ-গাছড়ার নমুনা, সামনে উভে

ফলের প্রসঙ্গে আরো একটি কথা মনে পরে গেলো। চাচার বাসার উল্টাদিকের বাড়ীতে বেশ বড় একটি গাছ ছিলো রাস্তা ঘেষে। খেয়াল করছিলাম বেশ কিছু ফল পরে আছে ফুটপাতে বা গাছের আশে-পাশে, কিন্তু কেউই এই ফল তুলে না। একদিন কাছে গিয়ে দেখি ফলগুলো হলো আপেল। আমাদের দেশে আপেল এতো মহার্ঘ, অথচ এখানে দেখি মাটিতে গড়াগড়ি খায়। এরকম আপেল গাছ আরো কিছু দেখেছি, কিন্তু সব জায়গায় একই অবস্থা। ফল পেকে ঝড়ে পরে, কিন্তু কেউ খায় না। সবাই দোকান থেকে কিনেই খায়। এইটা কোন কথা হলো।

ষ্টকহোমে থাকাকালিন সবচেয়ে বেশী খেয়েছি মনে হয় কলা। বেশ বড়সর কলা। সবই নাকি দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আমদানী করা।

আজ এপর্যন্তই। ভাল থাকবেন।

(বাসায় আব্বা-আম্মা দূ’জনেই অসুস্থ। তার মধ্যে আম্মার অবস্থা বেশী ভাল না। তাই ইচ্ছে থাকা থাকলেও নিয়মিত ব্লগ লেখা ব্যাহত হচ্ছে।)

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।