ষ্টকহোম ডায়েরী (৫)

কারখানা থেকে ঠিকই ষ্টেশনে পৌছালাম এবং শেষমেষ বাসাতেও। তবে রনি যে পথটা দেখিয়ে দিয়েছিলো, সে পথে না গিয়ে ভুলে সোজা চলে গিয়েছিলাম। ফলে আমি ষ্টেশনে পৌছেছিলাম একটু ঘুর পথে ষ্টেশনের পিছনের প্রান্ত দিয়ে। আর এই ভুল ধরা পড়েছিলো প্রায় ২ সপ্তাহ পর। সে কাহিনী অন্য দিন।

টাইম টেবল দেখে হিসাব করে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখলাম পরদিন কাজে যাওয়ার জন্য। ষ্টকহোমে অফিস আওয়ার / রাশ আওয়ারে বাস / ট্রেন চলে খূব ঘন ঘন। হয়তো ৫/১০ মিনিট পর পর। অন্য সময় দুই বাস / ট্রেন চলার মধ্যে সময়ের পার্থক্য কিছুটা বেশী। আমাকে প্রথমে বাসে যেতে হবে সাবওয়ে ষ্টেশনে, সেখান থেকে সেন্ট্রাল ষ্টেশনে, সবশেষে ট্রেনে চেপে সোদাতালিয়ায়। সব কিছুই দ্রুতগতির, তবে কোন একটা মিস করলে সেদিনের হাজিরা কাটা যাবে। রাতেই বড় ভাবী আমার জন্য বেশ কিছু স্যান্ডউইচ তৈরী করে রাখলেন। আমাকে কেবল মাইক্রোওভেনে গরম করে নিতে হবে। সুইডেনে গিয়ে ‘জীবনে প্রথম দেখলাম’ টাইপ যেসব জিনিস আছে সেগুলোর মধ্যে মাইক্রোওভেন অন্যতম। আরো ছিলো ডিশওয়াশার আর ওয়াশিং মেশিন। পরের দু’টো ছবি বা মুভিতে দেখেছিলাম, তবে চর্ম চক্ষে দেখা সেইবারই প্রথম। আমি দু’টো স্যান্ডউইচ খেয়ে, আর দু’টো টিফিন বক্সে নিয়ে রওনা হলাম। সামার বলে সূর্য উঠে গেছে। কিন্তু বাসার সবাই তখন গভীর ঘুমে। বাসে উঠলাম, সাবওয়েতে আসলাম। শেষে ট্রেনে চেপে সোদাতালিয়ায়। ষ্টেশন থেকে ঘুর পথে কারখানায়। কাপড় চেঞ্জ করে কার্ড পাঞ্চ করে এসেম্বলি লাইনের সামনে আসতেই দেখা হলো রনি আর আকবরের সাথে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কারখানার সাইরেন বাজলো আর লাইন ঘুরতে শুরু করলো। শুরু হলো আমার শ্রমিকের জীবন।

প্রথমদিন কি কি কাজ করেছিলাম আজ আর তেমন কিছু মনে নেই। তবে বেশীরভাগ অংশে আগে থেকে লাগানো বিভিন্ন পার্টসের নাট বল্টু টাইট দিতে হতো। কোন কোন জয়েন্টে রঙ আর তেল দিতে হতো। খূব সহজ, তবে কাজগুলো করতে হতো দ্রুত। ঘন্টায় ৭টা গাড়ী আসছে, আমার অংশটুকু নির্দিষ্ট। সেই নির্দিষ্ট অংশের মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে। গাড়ী তো লাইনের উপরে চলছে, আমার কাজ শেষ হলে আরেক জন শুরু করছে তার অংশের কাজ। আর আমার অংশে চলে আসছে নতুন আরেকটা গাড়ী। এই সময় মেইনটেইন করতে না পারলে পুরো লাইনেই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যাবে। রনি এবং তার সহকারীরা এই দিকে কড়া নজর রাখেন। প্রয়োজনে এক আধবার নিজেরাও হাত লাগান যাতে কোন সময় নষ্ট না হয়। আমার সাথে যেহেতু আকবর ছিলো প্রথম দিকে তাই সমস্যা হয় নাই। কিন্তু একা কাজ করার সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি কাজ আসলে সহজ না। দেশে থাকতে তেমন কোন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিলো না। তাই কাজ করতে করতে সহজে হাপিয়ে উঠতাম। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা খাওয়া-দাওয়ায় কখনই কার্পন্য করেন নাই, তারপরও এই কারখানায় কাজ করতে করতে মনে হয়েছিলো আমরা ইউরোপীয়দের তুলনায় একেবারেই ফিজিক্যালি ফিট না।

একটা উদাহরণ দেই। কারখানায় নাট-বল্টু-স্ক্রু টাইট দেয়ার জন্য কিছু টুলস ছিলো, যার অনেক গুলিই চলতো কমপ্রেসড এয়ারে। দেখতে অনেকটা ড্রিল মেশিনের মতো। মাথায় ড্রিল বিটের মতো অংশগুলো খোলা যায়। ড্রিল মেশিনের হাতলের যে অংশে তার থাকে সেখানে নজলের মতো একটা অংশ থাকে। এই জিনিসগুলি প্রথমে আমার কাছে অসম্ভব ভারি মনে হয়েছিলো। অথচ বেশীরভাগ কাজ করতে হতো এই ধরণের টুলস দিয়ে। আমার আশে-পাশের ছেলে-মেয়েরা দেখতাম অবলীলায় এইসব তুলতেছে আর কাজ করতেছে। ওদের হাতের পাঞ্জার সাথে আমার হাতের পাঞ্জা তুলনা করলে মনে হতো বাচ্চার হাত। ওদের ষ্ট্যামিনাও অনেক। আর্দ্রতা কম বলে ঘাম হতো না তেমন, দেশের তুলনায় তাই বেশীক্ষণ কাজ করতে পারতাম একনাগারে। টুলসগুলো চালানোর জন্য দরকার হতো কমপ্রেসড এয়ার। লাইনের দুইপাশে উচুতে দুটো পাইপ ছিলো সমান্তলাল। এগুলো থেকে আবার অনেকগুলো রাবারের পাইপ নেমে এসেছে। যার প্রতিটার মাথায় নজল আছে। এই পাইপগুলো টুলসের হাতলে যে নজল ছিলো সেটার ভিতর চাপ দিয়ে লাগাতে হতো। প্রথম প্রথম তো এই নজল লাগানো আর খুলতেই জান বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সকালের দিকে না হলেও, লাঞ্চের পর শরীরের আর বল পেতাম না তখনই এইসব জিনিস মনে হতো কয়েক টন ওজনের। লাগাতে আর খুলতেও কষ্ট হতো। একদিন তো লাগাতে গিয়ে আর পারছি না। আমার পিছনের অংশের এক মেয়ে দৌড়ে এসে ঝটপট লাগিয়ে দিলো। পরে অবশ্য একটা সিস্টেম বের করেছিলাম। দুই পায়ের (রানের) মাঝে চেপে ধরে নজল লাগিয়ে ফেলতাম। এই ব্যাপার দেখে একদিন এক ছেলে হাসতে হাসতে যা বললো তার মর্মার্থ হলো ‘মেয়েলি বুদ্ধি’। কি আর করা। হজম করা ছাড়া আর কিছু বলার ছিলো না।

ঘন্টা দেড়েক কাজ করার পর মনে হয় প্রথম ব্রেক। নাশতার জন্য। আমি একটু চিন্তায় পরলাম। স্যান্ডউইচ এনেছি ২টা, দুপুরে লাঞ্চের কথা চিন্তা করে। বেশী চিন্তা না করে একটা খেয়ে কফি খেলাম। যতোই তিতা হোক এই ব্ল্যাক কফি, খেলে মনে হয় শরীরে হারানো শক্তি ফিরে আসছে। নাশতা আর লাঞ্চের মধ্যে আরেকটা কফি ব্রেক ছিলো। আর লাঞ্চের পর ছুটি হওয়ার আগে আরেকটা। আমি নাশতা করে ওদের দোকানের খাবার-দাবার দেখতে গেলাম। বড় বড় সব স্যান্ডউইচ। পুরো রুটির স্লাইস দিয়ে তৈরী। বাইরে দিয়ে পনিরের মতো কি যেন বের হয়ে আছে, কিন্তু রং গোলাপী। জিজ্ঞেস করে জানলাম এগুলো সব পর্ক, মানে ‘ইয়ে’ আর কি। খাবার যা আছে সবই এজাতীয়। এর বাইরে আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিঙ্কস আছে। দাম মোটামুটি সস্তাই। কারণ কারখানা থেকে সাবসিডি দেয়। 

লাঞ্চ আওয়ারে খাওয়ার পর সবাই দেখি চিৎকাইত অবস্থা। লাইনের একদিকে থাকতো বিভিন্ন পার্টস / টুলস। এসব থাকতো কাঠের ক্রেটে। আশেপাশে প্রচুর প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল থাকতো, বিশেষ করে এক/দেড় ইঞ্চি সাইজের ফোম। অনেকেই এই ফোম ক্রেটে রাখা পার্টসের উপর বিছিয়ে  শুয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বসে আছে ক্রেটের উপর। নতুন লোক বলে অনেকেই এগিয়ে আসলো কথা বলার জন্য। অনেকের সাথে পরিচয় হলো। হাই হ্যালো বললাম। সবাই স্থানীয়। আমি, আকবর আরেকটা ছেলে ছিলো বাইরের। আকবর ছিলো ইরানের আর অন্য ছেলেটা ছিলো ডেনমার্ক অথবা ফিনল্যান্ডের। ৩/৪ জন মেয়েও ছিলো। আমাদের শেডে খূব বেশী মেয়ে ছিলো না। তবে পুরো কারখানায় আরো অনেক মেয়ে ছিলো।

নানারকম কথা হলো। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না ওরা। যতটুকু পারলাম বললাম। প্রায় সবারই প্রশ্ন ছিলো দেশে গার্লফ্রেন্ড রেখে এসেছি কিনা। যখন বললাম আমার গার্লফ্রেন্ড নেই, তখন ওদের চোখগুলো ছিলো দেখার মতো। প্রথম প্রথম এটা নিয়ে একটু বিব্রত হতাম। তবে ওরা যে বিয়ে না করে লিভ টুগেদার করে ব্যাপারটা জানার পরও ওখানে গিয়ে যখন দেখতাম বা শুনতাম গার্লফ্রেন্ডের সাথে থাকছে এবং বাচ্চা-কাচ্চাও আছে, তখন কেমন যেন লাগতো। পরে অবশ্য এনিয়ে অনেকের সাথেই কথা হয়েছে।

অবশেষে চরম রকমের টায়ার্ড হয়ে প্রথম দিনের কাজ শেষ করলাম। একদিকে টায়ার্ড, অন্যদিকে ক্ষুধায় পেট চেঁ চোঁ করছে। কাপড় চে্ঞ্জ করতে গেলাম। লকার রুমের সা্থেই বাথরুম। দরজা-টরজা নাই। আমাদের দেশে বিভিন্ন শপিং মলে যেমন দুই সাইডে পার্টিশন দিয়ে ইউরিনেটর বসানো থাকে, এখানেও তেমন ভাবে গোসলের ব্যবস্থা। প্রায় কাঁধ সমান উচু পার্টিশন, সামনের অংশে কিছু নাই। ছেলেরা কাপড় খুলে সম্পূর্ণ দিগম্বর হয়ে গোসল করছে। আগের দিন আকবরের কথার মাহাত্ম টের পেলাম। গোসল করার দরকার ছিলো। কিন্তু এভাবে !?! যদিও অনেক পরে বার দূয়েক গোসল করেছিলাম। যদ্দেশে যদাচার।

কাপড় চেঞ্জ করে হেটে ষ্টেশনে আসলাম। ট্রেনে চেপে সেন্ট্রাল ষ্টেশন। বাসে / ট্রেনে কখনই আমার ঘুম আসে না। তারপরও চোখ বন্ধ করে পরে ছিলাম ট্রেনে। সেন্ট্রাল ষ্টেশনে নামার পর তো ব্যাপক ক্ষুধা লাগতেছিলো। পেটে ক্ষুধা নিয়েই বাসায় আসলাম। গোসল করে নাশতা করলাম। এরপর ঘুম। রাতে খাওয়ার টেবিলে বড় আম্মা জিজ্ঞেস করেছিলো স্যান্ডউইচ পরিমান মতো ছিলো কিনা। আমি আর শরমে কিছু বলি নাই।

ঘড়িতে এলার্ম চেক করে সোজা বিছানায়। আবারও ঘুম।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।