ষ্টকহোম ডায়েরী (৭)

ভোরে উঠে বের হচ্ছি কাজে, কাজ করছি, বাসায় ফিরছি। এই ভাবে চলছিলো প্রবাস জীবন। বাসায় ফিরে কোথাও যাওয়ার মতো ইচ্ছে বা শক্তি কোনটাই থাকতো না। শনি-রবিবার ছুটি। প্রথম দিন ঘুমেই কাটতো আধা বেলা। কোন কোন দিন সকালে হয়তো বিশেষ কোন কাজ থাকলে বের হতাম। বিকালের দিকে হয়তো কাজিনের সাথে বের হতাম আশে-পাশে ঘুরতে। তবে প্রথম ১/২ মাসে তেমন কিছু দেখা বা সেই অর্থে সুইডেন সম্পর্কে জানা বোঝা হয়নি। কোন কোন সপ্তাহে অবশ্য বাসার সবার সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হতো।

ষ্টকহোম পৌছানোর কয়েকদিন পর একদিন সন্ধ্যায় বড় কাক্কা তার রুমে ডেকে পাঠালেন। প্রথমে কাজ কর্ম কেমন হচ্ছে, কোন অসূবিধা হচ্ছে নাকি এসব নিয়ে জানতে চাইলেন। পরে আসল কথা পাড়লেন। বললেন আমি যেন আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই দেশে ফিরে যাই, সুইডেনে অবৈধভাবে থাকার চেষ্টা না করি। তবে তিনি এসব বলার সময় অহেতুক এমন কিছু বললেন যাতে খূবই মর্মাহত হয়েছিলাম।

যাই হোক। যা নিয়ে বলছিলাম। ভিসা শেষ হলে সোজা দেশে ফিরতে হবে এটা বলার অবশ্য কারণ তৈরী হয়েছিলো আমি যাওয়ার আগেই। দু’জনে মিলে ১৯৮৭ সালে যখন ষ্টকহোম আসেন সাথে করে একজন বাবুর্চি এবং একজন মহিলা গৃহকর্মী নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ছেলে এবং তাদের পরিবার যায় আরো পরে। বাবুর্চি ছিলো একেবারেই বকলম, আর মহিলাটি সামান্য লেখাপড়া জানতেন। দু’জনের কেউ ই বাংলা ছাড়া আর আর কোন ভাষা জানতেন না। তাদের বেতন দেয়া হতো বাংলাদেশে, আর সুইডেনে চলার জন্য যা লাগে সবই পেতেন। যেহেতু তারা বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলতে পারতেন না, বাসার বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে বিধি-নিষেধ ছিলো। বড় আম্মা গ্রোসারি অথবা মার্কেটে গেলে সব সময়ই গৃহকর্মীকে সাথে নিয়ে যেতেন। শনি-রবিবার অন্য কোন প্রোগ্রাম না থাকলে অনেক সময়ই দু’জনকে সাথে নিয়ে ঘুরতে যেতেন।

এভাবেই চলছিলো। হঠাৎ করে বাবুর্চি অসুস্থ্য হয়ে সব ওলট পালোট হয়ে গেলো। অসুস্থ্য বাবুর্চিকে স্থানীয় এক হাসপাতালে নেয়া হলো চিকিৎসার জন্য। যেহেতু ইংরেজী বা সুইডিশ বলতে পারে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই একজন বাংলাভাষীকে ডেকে আনলেন অনুবাদক হিসেবে। চিকিৎসা হলো, বাবুর্চি বাসায় ফিরে এলো এবং ২ দিনের মাথায় গৃহকর্মীকে নিয়ে পালিয়ে গেলো সূযোগ বুঝে। বড় কাক্কা প্রায় সাথে সাথেই পুলিশ ষ্টেশন সহ প্রয়োজনীয় সব জায়গাতেই রিপোর্ট করলেন। পুলিশ কিছু সময় পরে জানালো দু’জন তাদের কাষ্টোডিতেই আছে, তারা নাকি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে। তবে সুইডিশ আইন অনুযায়ী তাদের সাথে যোগাযোগ করা বা কথা বলার কোন সূযোগ ছিলো না।

পরে যা জানা গিয়েছিলো বিভিন্ন লোক মারফত তা হলো সেই বাংলাভাষী অনুবাদকই বাবুর্চিকে এই ব্যাপারে পরামর্শ এবং সাহায্য সহযোগীতা করেছিলো। পুলিশের কাছে বাবুর্চি অভিযোগ করেছিলো যে তাকে অত্যন্ত কম বেতন দেয়া হয়, ঘুমানোর সময় ছাড়া বাকি সময় কাজ করতে হয়, বাইরে যেতে দেয়া হয় না ইত্যাদি। তার বেতনের অংক শুনে তো সুইডিশ পুলিশ পুরাই নাকি তব্দা খেয়ে গিয়েছিলো। এই ইস্যুতে অবশ্য বাংলাদেশের সুইডিশ দূতাবাস এবং রাষ্ট্রদূত যথেষ্ঠ সাহায্য করেছিলেন। রাষ্ট্রদূত নাকি স্বয়ং বলেছিলেন যে বেতন দেয়া হয় ঢাকায় তিনি তার গৃহকর্মীকে তার চাইতে কম বেতন দেন। সে সাথে এটাও বলেছিলেন বাংলাদেশে সরকারী চাকরিতে ঢুকলে বেসিক বেতনও বাবুর্চির বেতনের চাইতে কম। এতো সব কিছুর পর যা হলো পুলিশ পুরো বিষয়টিই ঝুলিয়ে রাখলো। আর এদিকে শেষ সময়ে এসে কাক্কার সার্ভিস রেকর্ড খারাপ হয়ে গেলো।

তাই কাক্কা চাইছিলেন না যাতে যেন তেন প্রকারে আমি থেকে যাওয়ার চেষ্টা করি। সেটায় সমস্যা ছিলো না, ভাতিজা হিসেবে তাকে আরো বিপদের ফেলবো সেটা কখনই হতো না। তবে সাথে কাক্কা আরো যেসব কথা বললেন তাতে মাথাটাই বিগরে গিয়েছিলো। সেদিনই ঠিক করেছিলাম ভিসা না থাকলে অন্য কোন চেষ্টাও করবো না।

এভাবেই চলতে থাকলো কারখানার জীবন।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।