ষ্টকহোম ডায়েরী (৮)

ছোট খাটো কিছু ঘটনা
১. লাঞ্চ টাইম হলেই আকবর কোথায় জানি উধাও হয়ে যায়। একদিন লাঞ্চ শেষ করে নিরিবিলি একটা জায়গা খূজছিলাম আধ শোয়া হওয়ার জন্য। এক চিপায় দেখি আকবর, তার লাঞ্চ শেষ হয় নাই তখনও। আমাকে দেখে হেই বললো, ইশারায় বসতে বললো। দেখি প্লাষ্টিকের ছোট এক কন্টেনার থেকে কি যেন খাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম তোমার দেশের খাবার, উত্তরে বললো হু। কি যেন নাম বলেছিলো। বললো এখানকার সব খাবার তো হারাম, তাই বাসা থেকে নিয়ে আসে। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম স্যান্ডউ্ইচ নিয়ে আকবরের সামনে পরা যাবে না। কিন্তু একদিন ঠিকই সামনে পরলাম। আকবর সোজা আঙ্গুল তুলে বলে এটা তো হারাম। বললাম খূব ক্ষূধা লাগছিলো।

যাই হোক। কয়েকদিন পর লাঞ্চ আওয়ারে বেশ আড্ডা জমে উঠেছে। লক্ষ্য বস্তু আমি। এই বয়েসে গার্লফ্রেন্ড কেন নাই সেটা বের করার চেষ্টা হচ্ছে। বোবার শত্রু নাই, আমি তাই হেসে নিরুত্তর থাকার চেষ্টা করছিলাম। পরে অবশ্য আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য দিতে হলো। বাবা-মা পছন্দ করে দিলে তারপর বিয়ে করবো শুনে তো এক একজন মাটিতে পরে গড়াগড়ি দেয় আরকি। এপর্যায়ে আকবর এসে হাজির। এবার তাকে নিয়ে পরলো সবাই। শেষ পর্যন্ত আকবর জানালো ‘জনৈকা সুইডিশ বালিকা তাহার হৃদয় হরণ করিয়াছে’। আমি সরাসরি বললাম ‘বাসায় জানে’ ? সে মাথা নেড়ে আমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করলো। আমি আর কিছু বললাম না। পরে একসময় আকবর বললো এই বিষয় নিয়ে সে খূব দোটানায় আছে। কারণ বাসায় জানলে তুলকালাম হয়ে যাবে। এদিকে তার গার্লফ্রেন্ড তার এপার্টমেন্টে চলে আসতে বলতেছে। আমি বেবিফেস করে জিজ্ঞাসা করলাম ডেটিং এ যাও না ? উত্তর হলো শনি-রবিবার তো সেই মেয়ের এপার্টমেন্টেই বেশীরভাগ সময় থাকি, কিন্তু রাত্রে থাকতে পারি না বলে ইদানিং রাগ করতেছে। আমি বললাম তোমার ফ্যামিলি’কে বলো সুইডেনে থিতু হতে গেলে এর চাইতে ভাল বুদ্ধি আর নাই। আকবর হতাশ কন্ঠে বললো মানবে না। আর আমি মনে মনে বললাম খাদ্য বস্তুর বেলাতেই কেবল হারাম আর হালাল।

২. একদিন কাজে গেছি। কিছুক্ষণ কাজ করার পর মনে হলো লাইন স্লো চলতেছে। একফাঁকে খেয়াল করলাম কিছু ওয়ার্কার কাজ না করে গল্প করছে, আবার কিছুক্ষণ পর আবার কিছু কাজ করছে। কিছুক্ষণ পর এক ছেলের কাছে শুনলাম ‘গো স্লো’ চলছে। নাশতার সময় বিস্তারিত শুনলাম।

এই কারখানায় ৩টি শ্রমিক ইউনিয়ন কাজ করে। তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট ২টি ইউনিয়ন মিলে কিছু বিষয়ে দাবী-দাওয়া পেশ করেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে তারা ‘গো স্লো’ শুরু করেছে। এরজন্য অবশ্য আগে থেকেই নোটিশ দিয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ সে মোতাবেক লাইনের গতি ধীর করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো যারা গো স্লো করছে তারা কিন্তু অন্যদের উপর সেটা চাপিয়ে দিচ্ছে না। অন্যরাও এই নিয়ে কোন উচ্চবাচ্চ্য করছে না। যার যার বুঝ, তার তার তরমুজ টাইপের ব্যাপার। গো স্লো পার্টির কাছ থেকে শুনলাম এতে কাজ না হলে এরপর পূর্ণ কর্মবিরতি। তবে দাবী-দাওয়া কি নিয়ে ছিলো সেটা ঠিকমতো বুঝি নাই। একদিন পরেই আবার সব ঠিকঠাক। শুনলাম কারখানা ওভারহলিং এর পর কর্তৃপক্ষ দাবীদাওয়া নিয়ে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

৩. আমি যে ঘুর পথে ষ্টেশনে যাই সেটা প্রথম খেয়াল করেছিলো রনি। বাসায় ফেরার পথে সে আমাকে দেখেছিলো হন হন করে হাটছি। পরের দিন কারখানায় পৌছাতেই জিজ্ঞাসা করলো ঐদিকে কি কোন কাজে গিয়েছিলাম নাকি। বললাম না, আমি তো ঐদিক দিয়েই ষ্টেশনে যাই আর আসি। এরপর সে আকবর’কে ডেকে বললো ছুটির পর আমাকে যেন ষ্টেশনে লিফট দেয়। আকবর যথারীতি ওর গাড়িতে করে একবারে ষ্টেশনের সামনে নামিয়ে দিলো। পরের দিন ষ্টেশনের সামনের অংশ দিয়ে বের হতেই দেখি সামনে সবুজ লনে কারখানার পরিচিত কয়েকজন শুয়ে বসে আছে। হাই হ্যালোর পর জিজ্ঞাসা করলাম যাবে না ? একজন ঘড়ি দেখতে দেখতে বললো বাস আসলো বলে। আর ঠিক তখনই দেখলাম সবুজ রং এর একটা বাস এসে থামলো। সবাই লাইন ধরে বাসে উঠলো, কোন টিকেট কাটাকাটি নাই, পরে জেনেছিলাম কারখানায় যারা কাজ করে ষ্টেশন থেকে কারখানা পর্যন্ত ফ্রি। এবার কারখানায় রেডি হয়ে কার্ড পাঞ্চ করার পরেও দেখি অঢেল সময়। মানে মোটামুটি বিশ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করা যায়।

৪. মাস খানেক পর কিছু টাকা জমলে ব্যাংকে গেলাম। জানতে চাইলাম বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর উপায় কি ? তারা বললো একটা ওপেন চেক দিতে পারে ডলার বা পাউন্ড ষ্টার্লিং এ, সেটা যে কেউ ভাঙ্গাতে পারবে। ক্যাশ ডলার কিনে বড় কাক্কার কাছে দেয়া যায়, কিন্তু ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলে পাঠাতে রাজি হবেন কিনা এটা একটা বড় প্রশ্ন। কারো মাধ্যমে যে হাতে হাতে পাঠানো যায়, সেকথা অবশ্য তখন মাথায় আসে নি। শেষ পর্যন্ত ১০০ ডলারের একটা চেক নিলাম আব্বার নামে। এবং সেটা পাঠালাম বাই পোষ্ট রেজিষ্ট্রি করে। চিন্তায় ছিলাম শেষ পর্যন্ত পৌছাবে কিনা। ঠিকই শেষ পর্যন্ত পৌছেছিলো। ভিতরে চিঠিতে লিখেছিলাম আম্মার পান খাওয়ার জন্য। কাকতালীয ভাবে এর কিছুদিন পর বড় কাক্কাই একদিন জিজ্ঞাসা করলেন দেশে টাকা পাঠিয়েছি কিনা। বললাম, শুনে তো রাগ। বলে ওপেন চেক চুরি হলে তো যে কেউ ভাঙ্গাতে পারতো। জিজ্ঞাসা করলাম ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে কি পাঠানো যেতো ? বলে যে না, এটা নিয়মের বাইরে। পরে বলে তোমার কাজিনের এক ফ্রেন্ড দেশে যাচ্ছে, তার কাছে দেয়া যেতো।

৫. জুন মাস পুরোটা কারখানা বন্ধ। ওভারহলিং হবে কারখানা। প্রতিবছর এই সময় বন্ধ থাকে। রেগুলার যারা তারা পূরো মাসের বেতন পায়। সাথে বোনাস। আমি খোঁজখবর করছিলাম এই মাসটা কি করা যায়। শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতার সাথে আলাপ করলাম, সে বললো ওভারহলিং এর জন্য যে লোক লাগে তা আগেই সিলেক্ট করা হয়ে গেছে। তারপরও সে চেষ্টা করবে কোন কাজে দেয়া যায় কিনা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কারখানায় কোন কাজ পাই নি। ছুটি শুরু হওয়ার ২ দিনের মাথায় চিঠি আসলো কারখানা থেকে। আমাকে অতিরিক্ত ১০০০ ক্রোনা দেয়া হয়েছে ছুটি উপভোগের জন্য।

কি আর করা। মরিস’কে বললাম কোন কাজের ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখতে। শুয়ে বসে কাটালে যা জমেছে সব খরচ হয়ে যাবে। চাচার বাসায় থাকার কারণে থাকা-খাওয়ার খরচ নাই ঠিকই, কিন্তু মার্কেটে গেলে হাত কেবল নিশপিশ করে এটা-ওটা কেনার জন্য।

কয়েকদিন পর মরিস জিজ্ঞাসা করলো আমি সব ধরণের কাজ করতে রাজি আছি কিনা। বললাম কোন ব্যাপার না। সে উল্টা জিজ্ঞেস করলো – ক্লিনিং ? বলালাম নো প্রবলেম। পরদিন বেটাইমে এসে বললো চলো, তোমার জন্য একটা কাজ ঠিক করেছি।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।