আলাপন ৩০-৪-১৮

আলাপন ৩০-৪-১৮

কয়েক দিন ধরে ইউটিউবে বিবিসি ৩ এর একটা সিরিজ দেখছি – The World’s Strictest Parents – বৃটেনের প্রায় বখে যাওয়া কিশোর-কিশোরীদের সুপথে আনার প্রচেষ্টা। প্রতি পর্বে একজন কিশোর আর একজন কিশোরীর কাহিনী। প্রথমে তাদের সম্পর্কে বলা হয় তারা ঠিক ভাবে জীবন-যাপন করে। একই সাথে তাদের এই জীবন-যাপন তাদের পরিবারে ঠিক কি পরিমাণ সমস্যার সৃষ্টি করে। তাদের বাবা-মা-অভিভাবকদের বক্তব্যও নেয়া হয়। এরপর দেখা যায় তাদের কোন দূর দেশের কোন এক পরিবারে পাঠানো হয়। সেই পরিবারটি সম্পর্কেও কিছু বলা হয়। তারা নিজেরা কিভাবে তাদের নিজেদের সন্তান মানুষ করছেন সেটাও বলা হয়।

আমি এর আগে কালচারাল এক্সচেঞ্জের কথা শুনেছি। কালচারাল এক্সচেঞ্জে সাধারণত কোন একদেশের কোন এক ছেলে বা মেয়ে দূর দেশের কোন এক পরিবারে অবস্থান করে তাদের দেশ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে অবশ্য পরিবারের সাথে না থেকে কোন এনজিও’র সাথে থেকে কোন প্রকল্পে ভলান্টিয়ার হিসাবে কাজ করে। কিন্তু বখে যাওয়া ছেলে-মেয়েদের দূর দেশে পাঠিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা এই প্রথম দেখলাম। এপর্যন্ত যে কয়টি পর্ব দেখেছি সেখানে দেখা যায় হোষ্ট পরিবারের বাবা-মা অত্যন্ত কঠোর। ব্রিটিশ এক মেয়ে তার ভারতীয় হোষ্ট পরিবারের দেয়া পোষাক না পড়ায় আর কথায় কথায় স্ল্যাং ব্যবহার করায় বাড়ীর কর্তা মেয়েটিকে প্রায় জোর করেই ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন। পরে অবম্য মেয়েটি তাকে সরি বলে এবং তখন সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পালটায়।

যতগুলো পর্ব দেখলাম তাতে প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর জীবনেই কিছু না কিছু পজিটিভ পরিবর্তন এসেছে এই সপ্তাহ খানেকের বিদেশ ভ্রমনে। কেউ হয়তো সূবিধা বঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের সাথে কাজ করতে গিয়ে অনুধাবন করেছে তারা নিজেরা আসলে কতোটা ভাগ্যবান। কেউ হয়তো বাদানুবাদের এক পর্যায়ে গিয়ে অনুভব করেছে অন্যকে সন্মান না করলে আসলে নিজেও সন্মান পাওয়া যায় না। এইসব কিশোর-কিশোরীদের আরেকটা বড় সমস্যা হলো ধূমপান অথবা মদ্যপান। হোষ্ট পরিবারের প্রায় সবাই ভিন্ন ধর্ম বা কালচারের অংশ হওয়ায় তারা ছেলে-মেয়েদের ধূমপান বা মদ্যপানের মতো বিষয়ে কোনরকম ছাড় দেয় না।

এ প্রসঙ্গে আমেরিকানদের কথা মনে পরে গেলো। আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বাস করে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষজন কোন ধর্ম মানে না, তাই তারা ব্যাপক উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করে। তাদের পরিবার প্রথা আমাদের মতো না হলেও একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদেরও কিছু নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্রে দিয়ে চলতে হয়। আশির দশকের শেষ দিকে সুইডেনে স্বল্পকালীন অবস্থান কালে কিছু আমেরিকান তরুন-তরুনীর সাথে আলাপ হয়েছিলো। একদিন ভাষা শেখার স্কুলের ক্যাফেতে আলাপের সময় এক আমেরিকান তরুনী বলছিলো সুইডিশ তরুন-তরুনীদের রাস্তা-ঘাটে কান্ড-কীর্তি দেখে সে খূব লজ্জিত। আমি খূব অবাক হয়ে জানতে চাইলাম কি ধরণের কান্ড-কীর্তি – উত্তরে সে বলছিলো এখানে লোকজন রাস্তা-ঘাটে যেভাবে ‘ডিপলি কিস’ করে সেটা আমেরিকান লোকজন ঘরের ভিতরে করে, বাইরে না। আমি তখন হেসে বললাম আমার অবস্থা তোমার চাইতেও খারাপ। আমার দেশে লোকজন ঘরের ভিতরেও কারো সামনে এভাবে চুমু দেয় না, স্বামী-স্ত্রী হলেও না। আমাদের দেশে একমাত্র শিশুদেরকেই সবার সামনে চুমু দেয় লোকজন। সুইডেনে অবশ্য বাচ্চাদের চুমু দিতে দেখি নাই কখনও। সেই আমেরিকান মেয়ে আর অন্যান্য আমেরিকান ছেলে-মেয়েদরাও একবাক্যে বললো আমেরিকায় অনেক কিছুই হয়, তবে পরিবারে অনেক রেষ্ট্রিকশন এখনও ফলো করা হয়। ইউরোপে এই বিষয়টা অনেক হালকা।

যাই হোক। আমাদের দেশের বাবা-মা অনেক কনজার্ভেটিভ ইউরোপ আমেরিকার তুলনায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়ে বখে যায় কেবল তাদের হাতে কোনরকম চিন্তা-ভাবনা না করে খরচের জন্য টাকা দেয়ার কারণে। এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত অবজার্ভেশন। আপনি চাহিবা মাত্রই আপনার ছেলে-মেয়ের হাতে টাকা তুলে দিবেন এবং পরবর্তীতে খোঁজও নিবেন না তারা কিভাবে সেই টাকা খরচ করেছে – আপনার সন্তান বখে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। একটা বয়েসে সব কিছু অবজ্ঞা করার একটা প্রচেষ্টা থাকে। সেই সাথে থাকে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষন নিয়ন্ত্রিত হয় শুধূমাত্র পর্যাপ্ত পকেট মানি না থাকায়। আমাদের দেশে ছেলেদের ধূমপান নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, তারপরও কলেজে উঠার আগে বা পরে কিছু ধূমপায়ী তৈরী হয়ে যায় পরিবারের কর্তার ধূমপানের অভ্যাসের কারণে এবং সিগারেটের মূল্য মোটামুটি কম বলে (আমার বাল্যকালে ভাল মানের প্রতি শলাকা সিগারেটের দাম ছিলো ৫০ পয়সার মতো, ষ্টার ক্যাপষ্টানের মতো কমদামী সিগারেট পাওয়া যেতো প্রতি বাক্স ২ টাকায়)।

আরো অনেক দূস্কর্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা করতে পারে নাই এই লিমিটেড পকেট মানি পাওয়ার জন্য। অনেকটা সূযোগের অভাবে চরিত্রবান থাকার মতো ব্যাপার। মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন বখে যাওয়া সন্তান যদি আপনার চেনাজানার গন্ডিতে থেকে থাকে, খোঁজ নিয়ে দেখেন মূল কারণ হয়তো এই যথেচ্ছ টাকা হাতে পাওয়ার কারণেই। অনেক সময় আবার অতিরিক্ত শাসনের কারণেও ছেলে-মেয়ে বখে যেতে পারে। শুধূমাত্র একটু স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত শাসনে পিষ্ট হওয়া ছেলে-মেয়ে অসম্ভব সব কান্ড করে ফেলতে পারে।

আজকাল অবশ্য আমাদের মন-মানসিকতা এতোটাই নিচে নেমেছে যে ছেলে-মেয়েদের ভাল ফলাফল করার জন্য প্রশ্ন ফাঁসেও আমাদের আপত্তি নাই। টাকা খরচ করে ছেলে-মেয়েদের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করে দেয়াকে আমরা মনে হয় কেউ আর কোন অপরাধ বা নৈতিকতার চরম অবনতি বলে মনে করি না। সবাই করছে যখন দোষ কি !?!

ভালো থাকবেন !!!