১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমার বয়স আনুমানিক ছয় বছর। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টাই আমরা কাটিয়েছি তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিনিয়র স্টাফ কোয়ার্টারে। ততদিনে কোয়ার্টারের অধিকাংশ বাসিন্দাই এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের অংশে যতদূর মনে পড়ে, কেউই আর থাকতেন না। দোতলার এক আঙ্কেল আব্বার হাতে তাঁর বাসার চাবি দিয়ে গিয়েছিলেন, প্রয়োজনে যেন আমরা রাতে সেখানে আশ্রয় নিতে পারি। আমাদের বাসা ছিল চার তলায়।
এরই মধ্যে শুরু হলো সামরিক বিমানের ভয়ংকর বোমাবর্ষণ। বাসার জানালা থেকেই তেজগাঁও এয়ারপোর্টের হ্যাঙ্গার দেখা যেত। সাইরেন বাজলেই আব্বা জানালার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলতেন। কিন্তু আমরা শিশু মন নিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে আকাশে উড়তে থাকা বিমান দেখার চেষ্টা করতাম। প্লেনগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে এসে বোমা ফেলত। কখনো কখনো একাধিক বিমানের ডগফাইটও চোখে পড়ত।
এই পরিস্থিতিতে আব্বা কোয়ার্টারে থাকা আর নিরাপদ মনে করলেন না। সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন আমরা সবাই বড় চাচার বুয়েটের কোয়ার্টারে চলে যাব। সেখানে আরও কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। ঠিক সেই রাতেই কাছাকাছি কোথাও ভয়াবহ বোমা হামলা হলো। পরে শুনেছিলাম, পাশের একটি সরকারি অনাথালয়ে বোমা পড়েছিল। পরদিন বাসা ছাড়ার সময় নিচে নেমে দেখলাম—অনেক বাসার তালা বোমার শকওয়েভে খুলে গেছে। তখন অবশ্য এসবের অর্থ আমরা তেমন বুঝতাম না।
বড় চাচার বাসায় গিয়ে দেখলাম কড়া নিয়ম-কানুন। রাতে জোরে কথা বলা নিষেধ, লাইট বন্ধ রাখতে হতো। হারিকেন জ্বালিয়ে তার চারপাশে ব্রাউন পেপার দিয়ে বানানো ত্রিকোণ এক ধরনের আড়াল দেওয়া হতো, যাতে বাইরে থেকে আলো চোখে না পড়ে। আমরা যারা ছোট, তাদের সন্ধ্যার পর রাতের খাবার খাইয়ে ঘুমাতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বড়রা একটি ছোট রেডিওতে খবর শুনতেন।
আমার এক চাচাতো ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। একদিন দেখলাম, স্বপন ভাইয়ের খবর নিয়ে কয়েকজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাসায় এসেছেন। বড়রাই তাঁদের সঙ্গে কথা বললেন। যাওয়ার সময় শুধু আমরা ছোটরাই তাঁদের এক ঝলক দেখতে পেলাম। একজনের কাঁধে ঝোলানো পিস্তলটি বাঁধা ছিল মেয়েদের চুলের ফিতা দিয়ে। বড় হয়ে মনে হয়েছে, হয়তো সেটি তাঁর প্রিয় মানুষের ফিতা ছিল।
আরেকজন ছিলেন আমাদের এক খালু—তিনি ছিলেন আর্মির ডাক্তার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে পুরোপুরি নিস্তার পাননি। যুদ্ধের শুরুতে এক পাকিস্তানি অফিসার গুলিবিদ্ধ হলে খালু তাঁর অপারেশন করেছিলেন। শুধু এই কারণেই তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল; তাঁর সমসাময়িক অনেক বাঙালি অফিসারই বগুড়া সেনানিবাসে নিহত হয়েছিলেন। পরে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল আমার খালার সঙ্গে। ঢাকায় আসার পর তিনি মাঝে মাঝে বড় চাচার বাসায় আসতেন খালার সঙ্গে দেখা করতে, সঙ্গে থাকত এক পাকিস্তানি সৈনিক।
আমি আর আমার খালাতো বোন বলাকা সেই সৈনিকের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নাড়াচাড়া করতাম। একজনের পক্ষে সেটি খুব ভারী ছিল, তাই দু’জন মিলে এদিক-সেদিক করতাম। সৈনিকটি শুধু হাসত, মাঝে মাঝে কী যেন বলত। আমরাও অনেক কথা বলতাম, যদিও কেউ কারো ভাষা বুঝতাম না। স্বাধীনতার পর খালু যেমন ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যান, সেই সৈনিকটিও পালায়। পরে বড়দের মুখে শুনেছিলাম, সৈনিকটি ধরা পড়ে গিয়েছিল।
১৬ই ডিসেম্বরের আগের দিন থেকেই বড়দের ফিসফাস শুনছিলাম—কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কী ঘটবে, তা অবশ্য আমরা বুঝিনি। ১৬ই ডিসেম্বর সকালে অনেকেই বাইরে গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে চাইছিলেন। মুরুব্বিরা বলছিলেন, নিশ্চিত খবর না আসা পর্যন্ত কেউ যেন বাইরে না যায়। এরপরই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—খবর এল, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।
দুপুরের পর আব্বা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বের হলেন। বুয়েট কোয়ার্টার থেকে আমরা মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ হলের পাশ দিয়ে হেঁটে শাহবাগের দিকে যাচ্ছিলাম। রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর কিছু দূর পরপর ভারতীয় বাহিনীর গাড়ি। সবাই ভারতীয় সৈনিকদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিল, টুকটাক কথা বলছিল। আমিও কয়েকজনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম, তাঁদের অস্ত্র ছুঁয়ে দেখেছিলাম। আব্বা তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। পরে জানতে চেয়েছিলাম, কী কথা হচ্ছিল। আব্বা বলেছিলেন, তাঁরা ভারতের কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন—সেই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। ভাষা ছিল উর্দু-হিন্দির মিশ্রণ।
শাহবাগ মোড় পর্যন্ত গিয়ে আমরা আবার বাসার পথে ফিরলাম। রেসকোর্সের পাশ দিয়ে, বর্তমান দোয়েল চত্বর হয়ে শহীদ মিনারের দিকে পৌঁছালাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। শহীদ মিনারের কোনো স্তম্ভই তখন দাঁড়িয়ে ছিল না—কয়েকটি অংশ ভেঙে পাশে পড়ে ছিল। শুনেছিলাম, পাকিস্তানি বাহিনী বোমা মেরে এগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।
আরও একটু এগোতেই দেখলাম ছোটখাটো একটি ভিড়। শহীদ মিনারের সিঁড়ির গোড়ায় শুধু আন্ডারওয়্যার পরা এক ব্যক্তি চিৎ হয়ে পড়ে আছেন। পেটের ওপর লম্বা কাটা দাগ, পাশে রক্ত। লোকজন বলাবলি করছিল—নিশ্চয়ই সে একজন পাকিস্তানি সৈনিক, পালানোর সময় কেউ তাকে হত্যা করেছে।
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা আবার বাসায় ফিরে এলাম।
বাংলাদেশের পতাকা : উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত

ফেসবুক মন্তব্য