জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি

১৫ই অক্টোবর ১৯৮৫ সাল। রাতে বাসায় বসে টিভি দেখছিলাম, বাইরে বৃষ্টি। টিভি’তে হঠাৎ করেই খবর জানানো হলো জগন্নাথ হলে একটি ভবনের ছাদ ধ্বসে অনেকেই হতাহত। তখন তো আর এখনকার মতো স্যাটেলাইট টিভি, মোবাইল ইত্যাদি ছিলো না। ভরসা কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশন আর দেশী-বিদেশী রেডিও। রাতে আর তেমন খবর পাওয়া গেলো না। সকাল হতেই শুনলাম অনেক মারা গেছে, আহতও হয়েছে প্রচুর। হাসপাতালে রক্তের প্রয়োজন। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহিন আর ফারুক এসে হাজির। ওরা ঘটনাস্থলে যাবে। আমাকে নিতে এসেছে। আমি বোনকে বলে বাসা থেকে বের হলাম। শাহবাগ পার হতেই দেখি শত শত মানুষ। সবাই জগন্নাথ হলের দিকে যাচ্ছে। হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নানা জনের নানা মত। জগন্নাথ হলে গিয়ে দেখি পুরো এলাকা লোকারণ্য। সামনে আগানোরও উপায় নাই। মাইকে কিছুক্ষণ পর পরই ঘোষণা হচ্ছে – রক্তের প্রয়োজন আহতদের চিকিৎসার জন্য। কিছুক্ষণ পর জানা গেলো মৃতদের লাশ আনা হবে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে যার যার বাড়ীতে পাঠানো হবে। লাশ আসলো, কিন্তু উপচে পড়া ভীরের কারণে কাছে আর যেতে পারলাম না। এর ওর মূখ থেকে শুনলাম ৩৫/৩৬ জনের মতো মারা গেছেন দূর্ঘটনায়, অনেকেই হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। 

আমরা জগন্নাথ হল থেকে বের হয়ে টিএসসি’তে গেলাম। সেখানে আবার ভিন্ন দৃশ্য। শয়ে শয়ে তরুণ অপেক্ষা করছে রক্ত দেয়ার জন্য। রক্তের জন্য তখনো আবেদন জানানো হচ্ছে। তবে কোন কারণে রক্ত সংগ্রহ করার ব্যাগ আসতে বিলম্ব হচ্ছে। চারিদিকের পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমার কেমন যেন লাগছিলো। মনে হলো আমারও কিছু করা উচিত। আমি এক ফাঁকে গিয়ে নাম দিয়ে আসলাম। নাম দিতে গিয়ে বিপত্তি। আমি তখন একেবারেই শুকনা টিংটিং  এ চেহারা তরুণ। যিনি নাম নিচ্ছিলেন (ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন) তিনি প্রথমেই বললেন ফিট না, রক্ত নেয়া যাবে না। কেন জিজ্ঞাসা করতেই বললেন ছেলেদের ওজন কমপক্ষে ১১০ পাউন্ড হতে হবে রক্ত দেয়ার জন্য। বললাম ওজন মাপেন। ওজন মেপে দেখা গেলো কোন রকমে ১১০ পাউন্ড হয়। শেষবারের মতো বললেন দিবেন ? বললাম দিবো। উনি একটা স্লিপ কিছু একটা লিখে হাতে দিলেন। বললেন ব্যাগ আসলে এটা দেখিয়ে ব্যাগ নিতে হবে। আর খাতায় মনে হয় নাম / বয়স ইত্যাদি লিখে রাখলেন। 

আমি রক্ত দেয়ার জন্য নাম দিয়েছি শুনে শাহিন আর ফারুক তো প্রথমে বকাবকি শুরু করলো। এই স্বাস্থ্য নিয়ে কিভাবে রক্ত দিবো তাই নিয়ে ওদের চিন্তা। এদিকে ব্যাগের দেখা নাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যা ব্যাগ মজুদ ছিলো সব শেষ। অপেক্ষা চলছে রেডক্রস থেকে ব্যাগ আসার। এদিকে শাহিন আর ফারুক বাসায় ফিরে যেতে চাইছে। আমি বললাম ঠিক আছে তোমরা যাও, আমি বুয়েটে বড় চাচার বাসায় যাই। ওরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করলো আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার। ওরা রওনা দিলো বাসার দিকে আর আমি রওনা হলাম চাচার বাসার দিকে। চাচার বাসায় গিয়ে বড় আম্মা (বড় চাচী কাম বড় খালা) আর নানুর সাথে দেখা। জগন্নাথ হল নিয়ে কথাবার্তা হলো। আমি রক্ত দেয়ার জন্য নাম দিয়েছি শুে দুজনেই তীব্র আপত্তি জানালেন। ফেরার সময় নানু আলাদা করে ডেকে বললেন সোজা যেন বাসার দিকে রওনা হই। এই স্বাস্থ্য নিয়ে বীরপূরুষ হওয়ার দরকার নাই। 

আমার তখন পুরো জেদ চেপে গেছে। কপালে যাই থাকুক রক্ত দিয়েই তবে বাসায় যাবো। টিএসসিতে গিয়ে দেখি ব্যাগ এসে গেছে। ব্যাগ কালেক্ট করতে গিয়ে দেখি সেখানেও বিশাল লাইন। ভিতরে ঘাসের উপর বসে আছি লাইন আরেকটু পাতলা হওয়ার আশায়। হঠাৎ দেখি ফারুক আর শাহিন। আমি অবাক হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই একজন জবাব দিলো রক্ত দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে বাসায় পৌছে দেয়ার জন্য ফিরে এসেছে। কি আর করা। এই রকম শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যেও মনে হয় হেসে ফেলেছিলাম। 

ব্যাগ সংগ্রহ করলাম। আবার লাইন। বেশী দেরী হলো না, আমার টার্ন আসতেই একজন সিনিয়র ভদ্রলোক কোথা থেকে উড়ে এসে আমার হাত ধরলেন। “আরে এর নাম কে নিলো ?” আর আমাকে বললেন “তুমি তো রক্ত দিতে পারবা না।” আমি বললাম ওজন ১১০ পাউন্ড আছে, এখানেই মাপা হয়েছে। তিনিও একটু ইতস্তত করে বললেন দেখো অনেকেই দিচ্ছে, তুমি ইচ্ছে করলে নাও দিতে পারো। আমি তো দিবোই। শেষে ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। রক্ত নিতে গিয়ে আবার বিপত্তি, ভেইন খূজে পায় না। এই এতো বছর পরেও আমার ভেইন এখনও চিকন, আব্বার ভেইন পেতেও অসূবিধা হয়। প্রথমে একহাতে না পেয়ে আরেক হাতে নিডল দিলো, সেখানে আবার ফ্লো কম। আবার নতুন করে ভেইন বের করে আবার নিডল ঢুকালো। ব্যাগ যখন প্রায় ভর্তি হয়ে এসেছে ফ্লো এর অবস্থা দেখে সেই সিনিয়র ভদ্রলোক বললেন ওর এতোটুকুই থাক। আর নেয়া লাগবেনা। রক্ত দেয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই নাম না জানা ভদ্রলোক আমার মাথার কাছেই দাড়িয়ে ছিলেন, মাঝে মধ্যে মাথায় হাতও বুলিয়ে দিয়েছেন। রক্ত দেয়া শেষে বললেন কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তারপর বাসায় যেতে। অসূবিধা ফিল করলে যেন তাকে জানাই। 

বিশ্রাম নিয়ে বাইরে আসতেই ফারুক-শাহিনের সাথে দেখা। ওরা তো চিন্তায় অস্থির। শেষে ৩ জন মিলে রিক্সা নিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। রিক্সায় এঠার সময় শাহিন আবিস্কার করলো আমার টিশার্টের একজায়গায় বেশ কিছুটা রক্ত লেগে আছে। হয়তো ২য় নিডল লাগানোর সময় বের হয়েছিলো। বাসায় এসে প্রথমে কিছু বলি নাই। রাতে বলেছি। তবে আমার কোন সমস্যা হয় নাই। প্রথম বারের অভিজ্ঞতা থেকে আরো ৭/৮ বার রক্ত দিয়েছি। কখনই কোন সমস্যা হয় নাই। তবে এবার আব্বার জন্য রক্ত দিতে চাইলেও দিতে পারি নাই। বাংলাদেশে বয়স ৫০ হয়ে গেলে নাকি আর রক্ত নেয়া হয় না। 

আমরা শুনে এসেছিলাম ৩৫/৩৬ জন মারা গেছেন। কিন্তু সেদিন রাতে ভয়েস অফ আমেরিকার খবরে বলা হলো মৃতের সংখ্যা ৭০ জনের মতো। পরদিন পত্রিকাতেও নাম পরিচয় সহ দেয়া হয়েছিলো ৩৫/৩৬ জন মারা গেছেন। কয়েকদিন পরই পল্টনের আমেরিকান বাই সেন্টিনিয়াল হলে ভয়েস অফ আমেরিকার একটা অনুষ্ঠান ছিলো। কেউ একজন এসেছিলেন, নাম মনে নাই এতো বছর পর। শেষের দিকে আসলেন ভয়েস অফ আমেরিকার ঢাকাস্থ প্রতিনিধি প্রয়াত গিয়াস কামাল চৌধূরী। তাকে পেয়েই জিজ্ঞাসা করলাম ভয়েস অফ আমেরিকা মৃতের সংখ্যা এতো বাড়িয়ে বললো কেনো। তিনি জানালেন তিনি নিজে গুণে গুণে ৩৫/৩৬ টা মৃতদেহ পেয়েছিলেন, সেটাই রিপোর্টে পাঠিয়ে ছিলেন। ভয়েস অফ আমেরিকা সবসময়ই ২/৩টা সোর্স থেকে কনফার্শেশন না পেলে সেটি প্রচার করে না। হয়তো তাদের অন্যান্য সোর্স সংখ্যা বাড়িয়ে বলেছিলো।

আজ এতো বছর পর বিবিসি বাংলায় জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির খবর পড়ে স্মৃতি সব ভিড় করলো। 

বিবিসি’র খবর 

ভাল থাকবেন।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।