বাংলাদেশের ইকমার্স এবং আমাজন

১. বাংলাদেশের ইকমার্সের বয়স কত ? জানা নেই। বর্তমানে যে নেট ভিত্তিক ব্যবস্থা সেটি খূব বেশীদিন আগের না। কয়েক বছর হবে হয়তো। আদ্যিকালে অবশ্য ম্যাগাজিনের গ্রাহক হওয়ার প্রচলন ছিলো। সাধারণত ঢাকা বাদে অন্যান্য জেলা শহরে বা মফস্বল এলাকার জনগণ যাতে নিয়মিত ম্যাগাজিন পেতে পারে তার জন্য এই ব্যবস্থা ছিলো। প্রকাশ হওয়ার পর সেগুলি ডাকে পাঠানো হতো। গ্রাহক হওয়ার জন্য টাকা মানি অর্ডার করে অথবা অফিসে সরাসরি গিয়ে জমা দিতে হতো। সেবা প্রকাশনীর বই ও অবশ্য এভাবে পাওয়া যেতো। সেবা প্রকাশনীর অবশ্য প্রকাশিত এবং ষ্টকে থাকা বই এর ক্যাটালগও ছিলো।

২. বিদেশী কমিকস বা ম্যাগাজিনের সুবাদে মেইল অর্ডার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলাম। কমিকস / ম্যাগাজিনের বিভিন্ন পাতায় এবং অবশ্যই শেষের কয়েক পাতায় বিভিন্ন জিনিসের বিজ্ঞাপন থাকতো। কখনও বিজ্ঞাপনের সাথে ছোট ফর্মও থাকতো। কেউ সেই ফর্ম পূরণ করে ডাকে পাঠিয়ে দিলেই কাঙ্খিত জিনিস চলে আসতো। তবে এই মেইল অর্ডার সম্পর্কে হাতে কলমে জানতে পারি ১৯৮৯-৯০ সালে স্বল্পকালিন ষ্টকহোম থাকাকালিন। পত্রিকায় এরকম অনেক বিজ্ঞাপন প্রকাশ হতো প্রতিদিন। আবার বড় বড় মেইল অর্ডার কোম্পানি ৩/৪ মাস পর পর ঢাউস সব ক্যাটালগ প্রকাশ করতো। সেগুলি আবার বিলি করা হতো ডাক মারফত। সেই সব ক্যাটালগের কোন এক অংশে অর্ডার করার জন্য ফর্ম সংযুক্ত থাকতো। সেটি পূরণ করে ডাকে ফেললেই হলো। সাধারণত বড় মেইল অর্ডার কোম্পানি গুলি এই সব অর্ডার ফর্ম পাঠানোর ডাক খরচ নিজেরাই বহন করতো। তাই গ্রাহককে আর ষ্ট্যাম্প কিনতে হতো না।

আমি নিজেও কয়েকবার এভাবে জিনিস কিনেছি। ফর্ম ডাকে ফেলার কয়েকদিনের মধ্যেই পোষ্ট অফিস থেকে একটা স্লিপ আসতো যে আমার নামে ‘অমুক’ কোম্পানি থেকে  একটি পার্সেল এসেছে। আমাকে ‘….’ টাকা দিয়ে সেটি ছাড়িয়ে নিতে হবে। সাথে সেই স্লিপ এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শনের বাধ্য বাধকতা ছিলো। এখানে বলে রাখা ভাল সুইডেনে সব ধরণের রেজিষ্ট্রি চিঠি এবং এইসব পার্সেল পোষ্টঅফিস থেকে বিলি করা হতো। বাসায় ডেলিভারি করা হতো আনরেজিষ্টার্ড চিঠি বা ছোট প্যাকেট। আর একজনের রেজিষ্ট্রি চিঠি বা পার্সেল কখনই অন্য কেউ নিতে পারতো না। পরিচয়পত্র (আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুরুপ) প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা ছিলো এই কারণেই। 

৩. আমার যতদুর মনে পরে কাইমু নামের এক প্রতিষ্ঠান থেকে আমি প্রথম অনলাইনে অর্ডার করি এবং বলতে গেলে প্রতারিত হই। ছোট একটি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার অর্ডার করেছিলাম, যা দিয়ে কম্পিউটার কিবোর্ড পরিস্কার করা যেতো বলে তাদের দাবি। জিনিস আসার পর দেখা গেলো এটি কেবল ঘুরে কিন্তু কোন কাজ হয় না। মানে কোন ধূলা-ময়লা টানতে পারে না। আমার পুরো ৩০০ টাকাই গচ্চা। প্রথম অর্ডারেই ধরা খাওয়ার পর অনলাইন কেনা কাটা সম্পর্কে এক ধরণের খারাপ ধারণা তৈরী হয়।

৪. ইকমার্সের পাশাপাশি আস্তে-ধীরে এফকমার্সও শুরু হয়ে যায়, মানে ফেসবুক ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ নানারকম জিনিস নিয়ে হাজির হয়। এগুলো সাধারণত ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা। আমি সাধারণত বিভিন্ন শখের জিনিস কিনতাম। ছোট-খাট কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও ব্যক্তি উদ্যোগ গুলি বরং অনেক বেশী রিলায়েবল ছিলো। ভুল হলে জানানোর পর তারা সেগুলির সমাধানও করতেন। এসব ছোট ছোট উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছিলো দিনে দিনে। তবে সবক্ষেত্রেই কিছু প্রতারক থাকে, এখানেই ছিলো। 

দু’টি প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই অত্যন্ত সুনামের সাথে ইকমার্স ব্যবসা করে যাচ্ছে – রকমারি এবং টেকশপ বিডি। দু’টি অবশ্য একই উদ্যোগের ফসল। অনলাইনে বই কেনার জন্য অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন প্রতিষ্ঠান রকমারি। আর ইলেক্ট্রনিক্স হবিষ্টদের কাছে প্রিয় টেকশপ।

৫. এইসব ইকমার্স / এফকমার্সের পাশাপাশি আরো কিছু উদ্যোগ চালু হয় যারা ইউএসএ / ইউকে / ভারতের বিভিন্ন অনলাইন শপ যেমন আমাজন, ইবে, ফ্লিপকার্ট ইত্যাদি সাইট থেকে জিনিস এনে দেয়। ডলার / পাউন্ড / রুপির রেট তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে দিতো। আর তা ছিলো সরকারী রেটের চাইতে বেশী। মূলতঃ তারা লাভ করতো এই অতিরিক্ত রেট থেকে। সাথে অবশ্য ওজন অনুসারে শিপিং খরচ দিতে হতো।

৬. ইকমার্স / এফকমার্সের প্রসারের সাথে সাথে আর্থিক খাতে সহায়তা দেয়ার জন্য বিকাশ / রকেট সহ বিভিন্ন ব্যাংক এগিয়ে এসেছে তাদের কার্ড সার্ভিস নিয়ে। সেই সাথে প্রসার ঘটছে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসেরও।

৭. কয়েক বছর আগে কাইমু কিনে নেয় দারাজ। আবার বছরখানেক আগে দারাজ কিনে নেয় চীনের আলিবাবা গ্রুপ। মনে হচ্ছে এরপর থেকেই বাংলাদেশে ইকমার্স অনেক বেগবান হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে রাজিব আহমেদ এবং তার প্রতিষ্ঠিত ই-ক্যাব জোড়ালো ভূমিকা রেখেছেন। ইকমার্স উদ্যোগগুলিকে নিয়ম নীতির মধ্যে আনা, ক্রেতাদের স্বার্থ দেখা সহ আরো বেশ কিছু কাজ তারা করেছেন। 

৮. এতো কিছুর পরও ক্রেতা সাধারণ এখনও মনে হয় ১০০% সন্তুষ্ট না। আজে-বাজে জিনিস গছিয়ে দেয়া, অস্বাভাবিক দাম রাখা, ভুল জিনিস পাঠানো এসব অভিযোগ তো আছেই। তবে দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কেটপ্লেসগুলো এখন তাদের মার্চেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিভিন্ন অনিয়ম এর। সেই সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও অভিযোগ পেলে শুনানী করে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

৯. এর মধ্যে খবর এসেছে যে আমাজন বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে। হয়তো এবছরের শেষে অথবা আগামী বছরের শুরুতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। এই নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। আমাজন বাংলাদেশের ছোট ছোট ইকমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য কতটা ভাল বা খারাপ। বেশীর ভাগ ক্রেতাদের মত হচ্ছে যারা সবকিছু ঠিক রেখে সুনামের সাথে ব্যবসা করছে, তাদের জন্য আমাজন কোন সমস্যা না। তবে যেনতেন ভাবে কিছু একটা গছিয়ে দিয়ে ক্রেতার টাকা পকেটে নিতে আগ্রহী তারা হয়তো প্রমাদ গুণতে পারে। যত দিন যাবে ক্রেতারা আরো বেশী সচেতন হবে।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।