————————————————————————————————————————————————————-
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত অথবা মৃত কোন মানুষের সাথে এর কোন সংশ্লিষ্টতা নাই। কোন ধরণের মিল খূজে পেলে সেটি নিতান্তই কাকতালীয়। আপনার উর্বর মস্তিস্কের কল্পনাও হতে পারে।
————————————————————————————————————————————————————-
ভবিষ্যতের বর্তমান –
আমি মঞ্জু, ফটোগ্রাফার। বয়স ৬৫ হতে চললো। একটি আন্তর্জাতিক ফটো এজেন্সির হয়ে কাজ করছি। দম ফেলার ফুসরত পাই না বলতে গেলে। অথচ ৫ বছর আগেও অবস্থা এমন ছিলো না। সত্যি কথা বলতে আমি আমার জীবনের প্রথম ৬০ বৎসর আসলে কিছুই করি নাই। না করেছি পড়ালেখা, না করেছি ভাল কোন চাকরি। ব্যবসা করতে গিয়েও ধরা খেতে হয়েছিলো। আব্বা মারা যাওয়ার আগে কিছু সঞ্চয়পত্র দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাই ছিলো সম্বল। একা মানুষ, বোনের বাসায় থাকতাম, এখনও থাকি। বোন টাকা-পয়সা নিতে চায় না। সঞ্চয়পত্র থেকে যা মুনাফা পেতাম সেটা দিয়ে নিজের খরচাপাতি চলে যেতো। নিজের জমানো কিছু টাকা ছিলো, সেটা বিনিয়োগ করেছিলাম শেয়ার ব্যবসায়। ৫ লক্ষ টাকার শেয়ারের বাজার মূল্য ছিলো ৩.৫ লাখ টাকার মতো। কখনও কিছু বাড়ে, কখনও কমে। মানে গড়পরতা ১.৫ লক্ষ টাকা লসে চলছিলো।
আরো একটা জিনিস ছিলো আমার – একটা ক্যামেরা। নাইকন ডি৭১০০, নিজের জমানো টাকায় কেনা। করোনার আগে-পরে ফটোগ্রাফি তেমন একটা হচ্ছিলো না। আব্বা আম্মা দু’জনেই অসুস্থ্য ছিলেন। আম্মা তো অনেক আগে থেকেই। ২০২১ সালে আম্মা আর ২০২২ সালে আব্বা চলে গেলেন। সেই সময়েই মাথায় এলো ফটোগ্রাফিটাই করতে হবে। নতুন করে ব্যবসা বা চাকরি কোনটাই করা সম্ভব না।
পূর্বাপর –
২০২৫ সাল। ফেসবুকে হঠাৎ করেই নজরে আসলো কেন্দ্রে ফটোগ্রাফি কোর্স শুরু হতে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরেই চিন্তা করছিলাম একটা কোর্স করতে পারলে ভালই হতো। আমি ফটোগ্রাফি শিখেছিলাম ইউটিউব দেখে। দীর্ঘদিন ফটোগ্রাফি থেকে দূরে থাকায় নিজের কনফিডেন্সও কিছুটা কমে গিয়েছিলো।
অরিয়েন্টেশন ক্লাসে গিয়ে দেখি সবাই প্রায় তরুণ, আমার মতো অল্প কয়েকজন। আস্তে ধীরে অনেকের সাথেই আলাপ পরিচয় হলো। পূর্ব পরিচিত কয়েকজন’কে পেলাম। তবে তারা ছিলো মেন্টর হিসেবে। পরিচিত একজনই ছিলো কোর্সমেট।
দিন যায়, ক্লাস হয়। ক্লাসের চাইতে কেন্দ্রের পরিবেশ ছিলো বেশী আনন্দদায়ক। আমি হয়তো ঘন্টাখানেক আগে চলে যাই। ক্লাস শুরুর আগে ছাদে আড্ডা। অনেকের সাথেই বেশ ভাল সম্পর্ক হয়ে গেলো। তবে মজার বিষয় হলো তারা বেশীর ভাগই আমার চাইতে অনেক ছোট, মোটামুটি ২০-৩০ বছরের ছোট। একসময় ক্লাস প্রায় শেষ, ফাইনাল আউটিং হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা এক্সিবিশনের। মাঝে মধ্যে কেন্দ্রে যাই। লাইব্রেরী থেকে বই আনি, আবার ফেরত দিতে যাই। কেন্দ্রে প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন অনুষ্ঠান থাকে। সেখানে অনেকের সাথেই দেখা হয়।
এই তরুণ বন্ধুদের মধ্যে তারিনের সাথে সম্পর্কটা ছিল সবচেয়ে গাঢ়। ৩৩ বছরের চমৎকার ও বুদ্ধিমান এক ব্যাংকার। বাসা আমার কাছাকাছি হওয়ায় ফেরার পথে বাসে প্রায়ই একসাথে ফিরতাম। তারিনের পারিবারিক গল্প, অফিসের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট – সবকিছুই সহজভাবে শেয়ার করত আমার সাথে।
আরেকজন ছিলো একা। ছোটমোট একটা মেয়ে, পড়াশোনায় দারুণ মেধাবী। কাজ করছিলো এক আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে, গবেষক হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই পছন্দের একজনের সাথে বিয়ে হয়েছিলো, কিন্তু টেকে নাই। এমনিতে খূবই হাসি-খুশী। আমার সাথে আলাপ-পরিচয় আরেকটু গভীর হওয়ার পর ওকে একদিন বললাম আমাকে যেন নানা বলে ডাকে। এসব নিয়ে কতো হাসি ঠাট্টা।
একার সাথে পরিচয় হওয়ার পর একসময় আমার মনে হলো উপরে মেয়ে যতোই হাসি-খুশী থাকুক না কেন, ওর আসলে মনে অনেক দুঃখ। আমার ৬০তম জন্মদিনে ও হুমায়ুন আহমেদের একটা বই প্রেজেন্ট করেছিলো। সেই বই নিয়ে কথা বলার সময় প্রথমে একটু খটকা লাগলো। পরে ওর ফেসবুক পোষ্ট দেখেও মনে হলো ওর মধ্যে হয়তো আত্মহত্যার প্রবণতা আছে। সমস্যা হলো তারিনের সাথে আমি যেমন সব কথা বলতে পারি, একা’র সাথে পারি না। ওর সাথে কেবলই হাসি-ঠাট্টা। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও ওর সাথে আমার তেমন আলাপ হয় নাই।
জীবন চলছিলো জীবনের মতোই। এমন সময় কানে আসলো কোর্সমেট এক আপা একা’র জন্য পাত্র ঠিক করেছেন। পাত্র আমাদেরই কোর্সমেট। তারও বিয়ে টেকেনি। আপা তাই এই দুই ঘরপোড়া গরু’র দুই হাত এক করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। ভাল খবর।
সেদিন রাতে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘড়িতে বাজে রাত দেড়টা। কি কারণে ঘুম ভাঙ্গলো, জানি না। মনে হলো বুকের একপাশে চিন চিন ব্যাথা। ব্যাথাটা একা’র জন্য।
কি আশ্চর্য !!! একা’র জন্য আমার খারাপ লাগবে কেন !?! আমার চাইতে ৩০ বছরের ছোট একটা মেয়ের জন্য আমি উতলা কেন হবো !?! কোনো যুক্তি ছিল না, কোনো ব্যাখ্যা ছিল না।
পরের কয়েকটা দিন নিজের ওপর ভীষণ রাগ আর অপরাধবোধে কাটল। কোনোদিন প্রেম করিনি, সংসার করিনি। আর জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে এসে এমন একজনকে ভালো লেগে গেল যাকে মনের কথা বলা তো দূরের কথা, নিজের অনুভূতির কথা ভাবতেও লজ্জা হয়!
ফেসবুকে মন খারাপের পোষ্ট দেখে প্রথমে তারিনই নক করলো। ও কিছুটা কনফিউজড। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো আমি তাকে নিয়ে চিন্তা করছি কিনা। তাকে কনফার্ম করলাম যে সে সেই মেয়ে না। এরপর শুরু হলো তার প্রশ্নবাণ। কে সেই মেয়ে, তাকে বলতেই হবে। আমি যতো বলি সম্ভব না। ততোই সে চেপে ধরে। শেষ পর্যন্ত সে একজন একজন করে কোর্সমেট মেয়েদের নাম বলা শুরু করলো। অবস্থা এমন যে সে হয়তো শেষ পর্যন্ত মারলিন আপার নামও বলে ফেলতো। মারলিন আপা আমার সমবয়সী কোর্সমেট, স্বামী-সন্তান নিয়ে সূখে ঘর করছেন।
আমি যতই বলি নাম প্রকাশ করলে আমার চাইতে বেশী বিব্রত হবে সেই মেয়ে। শুনে না। শেষ পর্যন্ত নাম বললাম। সে কেবল হাসে আর বলে ব্যাডা মানুষের মাথায় যে আসলে কিছু নাই সেটা আমাকে দেখেই এখন বুঝতেছে। আমি তাকে বললাম আমার সম্পর্কে যাই মনে আসে সমস্যা নাই, তবে ভুলেও যেন নাম প্রকাশ না হয়।
এভাবেই চলছিলো। একদিন হঠাৎ একা মেসেঞ্জারে নক দিলো। সেই কোর্সমেট সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চায়। আমি বললাম ছেলে তো ভালই মনে হয়। ভদ্রলোক টাইপ, ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি আছে। পড়াশোনাও আছে। আগে ভাল চাকরি করতো, এখন ব্যবসা করছে। আর দু’জনেরই যেহেতু একই রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, হয়তো সম্পর্কটা ক্লিক করবে। কেবল একটা বিষয় নিয়ে একটু খটকা আছে। কি সেই খটকা …..
এরপর থেকে শুরু হলো নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। নিজেকেই নিজে বুঝানো শুরু করলাম – সে তোমার জন্য নয়। তুমি কোন ভাবেই একা’র জন্য উপযুক্ত না। তোমার বয়স ৬০ বছর, মানে তুমি জীবনের অধিকাংশ সময় পার করে ফেলেছো। যে কোনদিন পটল তুলতে পারো। তার সাথে তোমার বয়সের পার্থক্য ৩০ বছর। এটা শুধূ বেশী না, অতিরিক্ত রকমের বেশী। হয়তো এই পার্থক্য অতিক্রম করা যায় যদি দু’জনেরই ভালবাসা প্রবল হয়। কিন্তু এখানে তো একতরফা। তুমি নিজেও জানো না এটা ভালবাসা নাকি কেবলই ভাললাগা। তারপর তোমার নিজের বাড়ী-গাড়ী কিছুই নাই। বোন সাপোর্ট না দিলে এই ঢাকা শহরে টিকতে পারতে। পারতে না। পড়াশোনায় তো পুরাই বকলম, ওর পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও তো তোমার নাই। আর শারীরিক ভাবেও তো ফিট না। বেঢপ একটা পেট বানিয়ে ফেলোছো। ভাল লাগে এটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো, হাত বাড়াতে যেয়ো না।
আবারও ভবিষ্যতের বর্তমানে …
কোর্স শেষ করেছি ৫ বছর হয়ে গেলো। কাজ করে যাচ্ছি। সেদিন মতিঝিল যাবো এক কাজে। উত্তরা উত্তর মেট্রো ষ্টেশন ঢুকতে যাবো এক মহিলাকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মহিলা রিক্সা ভাড়া দিচ্ছিলেন। খূব পরিচিত লাগছিলো। ভাড়া দিয়ে ঘুরতেই চোখে চোখ পড়লো – একা। আগের চেয়ে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে, গায়ের রং খানিকটা তামাটে।
সেই চেনা পরিচিত হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো – কেমন চলছে ? বললাম – চলছে। তোমার ? চলে যাচ্ছে আর কি। জিজ্ঞেস করবো কি করবো না ভাবতে ভাবতেই মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো – সাহেবের কি খবর ? ওদের বিয়ে হয়ে গেছে শুনেছিলাম আগেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো – উপরে চলেন।
বিয়ে টেকেনি এবারও। একা অনেক চেষ্টা করেছিলো। সমস্যা সেটাই যা নিয়ে আমার খটকা ছিলো। কথায় কথায় জানাল, এখন একাই আছে সে। পিএইচডি শেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে।
ট্রেন এসে থামল। একা মৃদু হেসে বলল, আমি লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠি, নানা।
স্টেশনের কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি ওকে দূর থেকে দেখতে লাগলাম। আমরা দুজনই আসলে একা। ভীষণ, ভীষণ একা।
————————————————————————————————————————————————————-
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত অথবা মৃত কোন মানুষের সাথে এর কোন সংশ্লিষ্টতা নাই। কোন ধরণের মিল খূজে পেলে সেটি নিতান্তই কাকতালীয়। আপনার উর্বর মস্তিস্কের কল্পনাও হতে পারে।
————————————————————————————————————————————————————-
