বাংলাদেশের পরিবহন খাত আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এই খাতের ৮০ শতাংশেরও বেশি মালিক সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে পরিবহন ব্যবস্থা শুধু সেবা খাত হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হিসেবে। প্রতিবছর এই খাত থেকে হাজার কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়, যার ভাগ-বাটোয়ারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থা। পুরোনো, ফিটনেসবিহীন বাসগুলো শুধু যানজটই বাড়ায় না, বরং বায়ু দূষণেও বড় ভূমিকা রাখে। ভারী ধাতুর দূষণ, ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনা, এবং জনদুর্ভোগ—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই অকার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণও হলো গণপরিবহনের এই দুর্বলতা।
এই নৈরাজ্য থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের দৃঢ় সদিচ্ছা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে—
প্রথমত, ঢাকার বাস রুটগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে পুনর্বিন্যাস (র্যাশনালাইজ) করতে হবে। এ জন্য একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ভিত্তিক কোম্পানি গঠন করা যেতে পারে, যা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান বাসগুলোকে এই কোম্পানির অধীনে আনতে হবে। মালিকদের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে রুট নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে, তবে ফিটনেস ও মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি বাসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে মোট বহরের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে বেসরকারি প্রভাব কমানো যায়।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে পুরোনো বাস সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালু বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
পঞ্চমত, নতুন বাস ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর উচ্চ শুল্কহার কমাতে হবে, যাতে আধুনিক যানবাহন সহজে আনা যায়।
ষষ্ঠত, চালকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, নিয়মিত বেতন, ভাতা, বিমা ও পেনশন চালু করা গেলে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ বাড়বে।
সপ্তমত, এই উদ্যোগ শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের সব মহানগর ও জেলা শহরে বিস্তৃত করতে হবে, যাতে একটি সমন্বিত ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, পরিবহন খাতকে সত্যিকার অর্থে “সেবা খাত” হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। নচেৎ এটি “শোষণ খাত” হিসেবেই থেকে যাবে। এই পরিবর্তনের জন্য জনসচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফেসবুক মন্তব্য