বাংলাদেশে আমাদের প্রায় সব বাবা-মায়েরই একটি সাধারণ স্বপ্ন থাকে – ছেলে-মেয়েকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অন্তত একজন উচ্চপদস্থ আমলা বানানো। এই স্বপ্ন এতটাই প্রবল যে অনেক সময় সন্তানের নিজস্ব আগ্রহ, দক্ষতা বা স্বপ্নের তেমন কোনো মূল্যই থাকে না। পরিবার ও সমাজের চাপের কাছে হার মেনে তারা এমন একটি পথে হাঁটে, যা তাদের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। ফলাফল হিসেবে আমরা প্রায়ই দেখি – অনেকেই কোনোভাবে একটি সাধারণ বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার হয়ে বসে থাকে।
এই সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং চাকরির বাজারের মধ্যে অসামঞ্জস্য। আমরা এখনও এমন একটি ধারণায় আটকে আছি যে, ভালো জীবন মানেই উচ্চশিক্ষা এবং সাদা কলারের চাকরি। অথচ বাস্তবতা হলো – সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তৈরি নয়, এবং সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রয়োজনও নেই। দক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্য আমরা এখনো যথেষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি।
শিল্পের প্রসার ছাড়া এই উচ্চশিক্ষা-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের হওয়া সত্যিই কঠিন। যদি দেশে পর্যাপ্ত শিল্পকারখানা, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ এবং দক্ষতা-ভিত্তিক পেশার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে অনেক তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবে। এতে করে উচ্চশিক্ষার উপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমবে।
আমি সুইডেনে গিয়ে একটি ভিন্ন বাস্তবতা দেখেছি। সেখানে অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে হাইস্কুল (আমাদের উচ্চ মাধ্যমিক) শেষ করেই কোনো না কোনো পেশায় যুক্ত হয়ে যায়। তারা বাস্তব জীবনের সাথে দ্রুত সংযুক্ত হয় এবং নিজেদের মতো করে জীবন গড়ে তোলে। শুধুমাত্র যারা একাডেমিকভাবে খুব ভালো এবং গবেষণায় আগ্রহী, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যায়। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা প্রায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
সুইডেনের পুরো সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে কেউ অভুক্ত থাকে না। যদিও সেখানে উচ্চ হারে ট্যাক্স দিতে হয়, তবে তা সম্পূর্ণ আয়ভিত্তিক। যার আয় বেশি, সে বেশি ট্যাক্স দেয়; আর যার আয় কম, তার উপর চাপও কম। এই ট্যাক্সের অর্থই আবার নানা সামাজিক সেবার মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরে আসে। জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্য ভাতা, বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা, বেকারদের জন্য ভাতা, প্রবীণদের জন্য পেনশন – সবই এই ব্যবস্থার অংশ। এমনকি গণপরিবহনেও রয়েছে ব্যাপক ভর্তুকি।
এই বাস্তবতা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে – শুধু উচ্চশিক্ষার পেছনে ছোটা নয়, বরং একটি সুষম সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলাই বেশি জরুরি। যেখানে শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে একজন কারিগর, উদ্যোক্তা বা টেকনিশিয়ানকেও সমান সম্মান দেওয়া হবে, যেমনটা আমরা একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারকে দিই।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ – কিন্তু তা সবার জন্য একমাত্র পথ নয়। আমাদের উচিত তরুণ প্রজন্মকে তাদের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া। পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পেশা ও দক্ষতার সমান মূল্য থাকবে। তবেই “উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন” বাস্তবতার সাথে একটি সুস্থ ভারসাম্য খুঁজে পাবে।
