ষ্টকহোম ডায়েরী (১৩)

উভে’র সাথে পরিচয়ের কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমি কাজ সেরে বের হয়েছি সবেমাত্র। পার্কিং লটে উভের সাথে দেখা। সাথে এক ছেলে। দেখতে উপমহাদেশীয়। উভে পরিচয় করিয়ে দিলো তোমার দেশী লোক বলে। ইংরেজীতেই কথা বলছিলাম। কথা বলে বুঝলাম ওর জন্ম এদেশেই। উভে এপর্যায়ে বললো তোমাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারো, আমি কিছু মনে করবো না। বাংলায় কথা বলতে গিয়ে দেখি আরো বড় বিপদ। সে ছেলে পারে সিলেটি আর সুইডিশ, সাথে কিছু ইংরেজি। সে অনর্গল সিলেটি শুরু করলো যার ১০% খূব বেশী হলে বুঝতে পারছিলাম। শেষে বাধ্য হয়ে বললাম ইংরেজীতেই কথা বলি। বাকি কথাবার্তা ইংরেজীতেই বললাম। পরে বাসায় এসে অনেকক্ষণ হেসেছিলাম। পরে উভে আমাকে বলেছিলো এই ছেলে বাবা-মা এবং পরিবার ছেড়ে তার সুইডিশ মেয়েবন্ধুকে নিয়ে আলাদা থাকে। এ নিয়ে পরিবারের সাথে কিছুটা মনোমালিণ্য চলতেছে। উভে আবার এই পরিবারের সাথে এতোটাই ঘনিষ্ঠ যে সে এসব ব্যাপার ভালই জানে এবং বুঝে। বাংলাদেশে যে লিভ টুগেদার খারাপ চোখে দেখা হয় এটাও সে জানে। এ ব্যাপারে সে আমার মত জানতে চেয়েছিলো – আমি কিভাবে দেখি ব্যাপারটা। বলেছিলাম যদ্দেশে যদাচার। যে ছেলের জন্ম সুইডেনে, জন্ম থেকেই এসব দেখতেছে – তার কাছে এগুলো ডালভাত মনে হতেই পারে। কিছুদিন পরেই এই পরিবারের কর্ত্রীর সাথে পরিচয় হয়েছিলো পোষ্ট অফিসে। আমাকে দেখেই কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন সুইডিশে। মহিলা শাড়ী পরা দেখে সোজা বাংলায় বললাম আপনি নিশ্চয়ই উভে’র প্রতিবেশী ? মহিলাও হেসে ফেললেন। কথা হলো কিছুক্ষণ। পরে পুরো পরিবারের সাথেই পরিচয় হয়েছিলো। ৩ ছেলে ১ মেয়ে। বড় ছেলে দেশে বিয়ে করে বৌ নিয়ে এসেছে। তাদের ছোট একটা বাচ্চা ছিলো। মেঝ ছেলে মেয়ে বন্ধু নিয়ে আলাদা থাকে। ছোট ছেলে স্কুলে পড়ে। আমি অবশ্য কিছুদিন পর দেখলাম এই ছোট ছেলে পোষ্ট অফিসে পার্ট টাইম একটা কাজ করে। কিন্তু সে ছেলে এতোটাই লাজুক যে কথাবার্তা প্রায় বলেই না। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে, বয়স খূবই কম ছিলো মনে হয়। ছেলে সিলেটি, কিছুদিন আগেই সুইডেনে এসেছে। বাবা আর বড় ছেলে কাছের কোন এক উপশহরে প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করে। মেঝ ছেলের মেয়েবন্ধুর সাথেও একদিন পরিচয় হলো। তারা দুইজনে মিলে বিশাল এক কুকুর পালে।

পরে কোন একদিন উভে’র বাসাতেও গিয়েছিলাম। ৩ রুমের ছোট বাসা। উভে একাই থাকে। তার বৌ বা মেয়েবন্ধু আছে কিনা কখনই জিজ্ঞেস করা হয়নি। বাসায় লিভিং রুমে টিভি’র উপরে এক মহিলা আর ছোট এক ছেলের ছবি ছিলো অবশ্য। আমি এক ঝলক দেখেই সামনে থেকে সরে এসেছিলাম। উভে’র সাথে আমার বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হয়েছে, কিন্তু সে নিজের বিয়ে বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কখনই কিছু বলে নাই। তার মা এর সাথে পরিচয় হয়েছিলো, তার বাসাতে ডিনারেও গিয়েছিলাম। সেখানে উভে’র ছোট ভাই আর মায়ের বর্তমান সঙ্গীর সাথেও দেখা হয়েছিলো। আমিও টিভি’র উপর ছবি দেখার পর সরে এসেছিলাম, মনে হয়েছিলো হয়তো এ বিষয়টি তার জন্য দূঃখের কিংবা অপ্রীতিকর।

উভে’র বাসায় যাওয়ার পর সে আমাকে এক মজার জিনিস খাওয়ালো। জিনিসটার নাম মনে নেই। উভে বলেছিলো তাদের ট্রাডিশনাল খাবার। আটার রুটি শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেলে যেমন এবরো-থেবরো হয়ে যায় – সেরকমই একটা রুটি। তবে সেটা আটার তৈরী ছিলো না মনে হয়। সেটার উপর ছোট ছোট পেঁয়াজ, টমেটো আর পনিরের কুচি দেয়া। খেতে অবশ্য বেশ লেগেছিলো। খাওয়া শেষ হতেই চলে এলো কফি। তখনই চোখ গেলো তার টেবিলে, জলজ্যান্ত একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার আর প্রিন্টার। ১৯৮৯ সালে খূব বেশী ডেস্কটপ কম্পিউটার / পিসি দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। বেশীর ভাগই দেখেছি ম্যাগাজিন অথবা পাশ্চাত্যের কোন সিনেমায়। বুয়েটে অবশ্য মেইনফ্রেম কম্পিউটার দেখেছিলাম একটা, তবে সেটি এতো কম বয়েসে যে কিছুই বুঝি নাই। আমার কাছে সেটি ছিলো একটা যন্ত্র। উভে’র এই কম্পিউটার দেখে তাই রীতিমতো বিষ্মিত হয়েছিলাম। পিসি অবশ্য সুইডেনেও নতুন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য। উভে’র কাছেই শুনেছিলাম পোষ্ট অফিসের আর ২/৩ জনের আছে। সবাই এবছর বা তার আগের বছরেই কিনেছে। এরপর উভে’র কাছ থেকেই পিসি চালানোর প্রথম পাঠ নিলাম। সেসময় অপারেটিং সিষ্টেম ছিলো ডস। উভে আমাকে ওয়ার্ড পারফেক্ট নামের এক ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যার খুলে দিয়েছিলো। আমি ইংরেজিতে আম্মার কাছে কয়েক লাইনের একটা চিঠি লিখলাম। উভে সেটা আবার প্রিন্ট করে দিয়েছিলো। মনে আছে বাসায় লেখা চিঠির সাথে সেটাও পাঠিয়েছিলাম। 

উভে’রা ছিলো ২ ভাই, উভে বড়। ওর বাবা ছিলো কসাই মানে বুচার। বেশ কয়েক বছর আগে হার্ট এটাকে মারা গিয়েছিলো। উভে আর ওর ছোট ভাই সব সময়ই ওর মায়ের খোঁজ খবর নিতো। দেশে থাকতে কত গল্প শুনেছি ইউরোপ আমেরিকার ছেলে-মেয়েরা ১৮ বছর হলেই ঘর থেকে বের হয়ে যায়, বাবা-মা’র খোঁজ খবর রাখে না। কারো কারো বেলায় হয়তো ব্যাপারটি সত্যি, আবার কারো কারো বেলায় সম্পূর্ণ উল্টো। আমি এরকম বেশ কয়েকটি পরিবার দেখেছি যারা নিয়মিতই বাবা-মা’র খোঁজ খবর নেয়। উভে তার মায়ের খোঁজ খবর তো নিতোই, মায়ের এপার্টমেন্ট যে মর্ডগেজ দেয়া ছিলো তার কিস্তিও শোধ করতো। আর এজন্যই সে সামারে এক্সট্রা কাজ করতো। পোষ্ট অফিসের নিয়মিত কর্মী হিসেবে সে একমাস সবেতন ছুটি পেতো, সেই ছুটিতেই সে এক এক বছর এক এক জায়গায় কাজ করতো। হেভি ভেহিক্যাল লাইসেন্স থাকায় সে বছর সে কোন এক পত্রিকা অফিসের ট্রাক চালিয়েছে একমাস।

পরিচয় হওয়ার প্রথম দিনই মহিলা আমাকে তার বাসায় ডিনারের দাওয়াত দিলেন। সেদিন উভে আর তার ছোট ভাই এর ও সে বাসায় ডিনার করতে যাওয়ার কথা। আমি সানন্দেই রাজি হলাম। অবশ্য মনে মনে একটু ভয়ও ছিলো। আমি ছুড়ি-কাটা চামচ ব্যবহার খূবই আনাড়ি, এখনও। উভে’কে বলেও ছিলাম সে কথা। আমরা যে হাত দিয়ে খাই, সেই সিলেটি পরিবারের কল্যানে উভে সেটা জানতো। হাসতে হাসতেই বললাম খাওয়ার সময় যদি দেখা যায় কেউ হাত দিয়ে খাচ্ছে একজন সুইডিশ কি ভাববে ? উভে হাসতে হাসতেই জবাব দিলো বারবারিয়ান্স।  উভে’র সাথে যথা সময়ে হাজির হলাম ওর মায়ের বাসায়। কিছুক্ষণ ওর ভাই এর সাথে আলাপ করলাম। ওর মা গল্প করার জন্য অস্থির ছিলো, সমস্যা হলো ভাষা। উভে’র মাধ্যমেই আলাপ হলো। উভে আবার কোন কোন প্রশ্ন অনুবাদ না করেই তার মাকে সহাস্যে কি যেন বলছিলো। বাসায় আরো একজন বয়স্ক লোক ছিলেন। সে ভদ্রলোকও সুইডিশ ছাড়া আর কিছু জানেন না। তাই হাই হ্যালো ছাড়া আর কিছু বলা গেলো না। আমি অবশ্য একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম উভে’র বাবা বেঁচে নেই।

ডিনারের কিছু দেরী ছিলো। বুড়ো-বুড়ি মিলে টেবিল সাজাতে লেগে গেলো। উভে জানালো আজ ডিনারে কোল্ড বিফ। টেবিল সাজানোর সময় উভে আমাকে জানালো এই বয়স্ক ভদ্রলোক তার মায়ের বর্তমান সঙ্গী। বাবা মারা যাওয়ারও পর তার মা খূব একা হয়ে পরেছিলেন। তারা মানে ছেলেরাও খূব বেশী সময় দিতে পারছিলো না। গত বছর কোথাও ঘুরতে গিয়ে এই ভদ্রলোকের সাথে তার মায়ের আলাপ। এই ভদ্রলোকও বিপত্নিক। পেশায় ছিলেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, তবে অবসরপ্রাপ্ত। কিছুদিন পরই তারা একসাথে থাকার পরিকল্পনা করেন। সেই সাথে আংটি বদল করেন। ওরা অবশ্য বিয়ে করুক আর নাই করুক আংটি ঠিকই বদল করে। তাই আমি ঠিক শিওর ছিলাম না এটি কি বিয়ে ছিলো নাকি সিম্পলি লিভ টুগেদার। এসব কথা তো আর জিজ্ঞাসাও করা যায় না। 

ডিনার সার্ভ করা হলো। কোল্ড বিফও চিনি না, কিভাবে কি দিয়ে খাবো তাও জানি না। উভে’র মা সবার প্লেটে কোল্ড বিফ সার্ভ করলেন। বড় এক প্লেটে ছিলো রুটি আর ছোট ছোট বাটিতে মাখন। আড়চোখে দেখলাম সবাই রুটিতে মাখন লাগিয়ে এক কামড় দিয়ে কোল্ড বিফ কেটে কেটে খাচ্ছে। কোল্ড বিফ দেখতে অনেকটা হান্টার বিফের মতো। তবে সেটি ভাঁজা না আর বেশ নরম। সুতরাং কেটে খেতে কোন সমস্যাই হচ্ছিলো। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কি যেন একটা ওয়াইন ছিলো, উভে আমাকে হাসতে হাসতেই বলছিলো এটা ওয়াইন মানে ফলের রসে তৈরী। লিকার না যেহেতু ট্রাই করতে পারো। আমিও হাসতে হাসতেই বললাম চাচার বাসায় তো ফেরত যেতে হবে, আউট হয়ে গেলে কে দায়িত্ব নিবে। আমার জন্য তাই বরাদ্দ করা হলো কোক। ডিনার শেষ হলো। এরপর প্রথমে এলো আইসক্রিম, এরপর কফি। এরই ফাঁকে উভের মা নিয়ে আসলেন ফটোর এলবাম। সব পারিবারিক ছবি। উভে’র ছোট বেলার ছবি দেখে খূবই মজা লাগছিলো তখন।

এরপর যাওয়ার পালা। ছেলেদের সাথে করমর্দন করে হেইডো বললাম। উভে’র মায়ের দিকে হাত বাড়াতেই তিনি দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন। আলতো করে জড়িয়ে ধরে গালে হালকা করে একটা চুমো। এই ব্যাপারটির সাথে মোটামুটি অভ্যস্ত তখন।

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।