হাসপাতাল

আব্বা-আম্মা-মামা-চাচা কারো না কারো অসুস্থ্যতায় তাদের সাথে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। প্রতিবারই মনে হয়েছে আমি অনেক ভাল আছি অন্যান্যদের তুলনায়। শারীরিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়লে মানুষ মানষিকভাবে ভেঙ্গে পরে। তাদের সাথে থাকা লোকজনও ক্ষেত্র বিশেষে চরম অসহায় হয়ে পরে। তবে প্রতিবারই দেখেছি হাসপাতালে থাকা রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা একে অন্যের প্রতি ব্যাপক সহানুভূতিশীল। হয়তো প্রায় একই ধরণের মানষিক যন্ত্রনার ভিতর দিয়ে যেতে হয় বলে তারা এই ধরণের সহমর্মিতা অনুভব করেন। তবে ব্যতিক্রমও আছে।

হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করার প্রথম অভিজ্ঞতা আম্মা ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর, ১৯৮৩ সালে। এর আগেও একবার আম্মা হাসপাতালে ছিলো ১৯৭৪ সালে পিত্ত থলির পাথর অপসারণের জন্য। তবে সেবার ছোট ছিলাম বলে হাসপাতাল ডিউটি বলতে যা বোঝায় সেটি করতে হয় নাই। আম্মা ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পরই প্রথমবার দায়িত্ব নিয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো। আব্বা সাধারণত অপিস করে রাত্রের খাবার খেয়ে হাসপাতালে আসতেন। বাকি সময় বোন, আমি বা অন্য কেউ পালাক্রমে থাকতাম। প্রাথমিক শঙ্কা কেটে যাওয়ার পর আম্মাকে কেবিনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তখন পিজি হাসপাতাল (বর্তমানের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ছিলো সাবেক হোটেল শাহবাগ এর মূল বিল্ডিং এ। রুমে সেই সময়েও কিছু কিছু ফার্নিচার ছিলো হোটেলের, যেমন – ড্রেসিং টেবিল, ক্লজেট ইত্যাদি। খাট অবশ্য ষ্টিলের তৈরী টিপিক্যাল হসপিটাল বেড।

আম্মাকে যে কেবিন দেয়া হয়েছিলো, সেটা বরাবর নিচ তলায় ছিলো তখনকার ইমারজেন্সি। বারান্দায় দাঁড়ালেই প্রতিদিন বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যেতো। যার কোনটাই ঠিক সূখপ্রদ না। আমার দুটো ঘটনা এখনও বেশ ষ্পষ্ট মনে আছে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, বিকালে। একটা পিকআপ এসে থামলো ইমার্জেন্সির সামনে। এক মহিলার কোলে বড়জোড় ৬/৭ বছরের এক মেয়ে। রক্তে একাকার। সবাই ধরাধরি করে ভিতরে নিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর মহিলাকে দেখলাম তার সাথে লোকজনই কিছুটা ঝোড় করে বাইরে নিয়ে আসছে। মহিলা উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করছেন। ছুটে ভিতরে যেতে চাইছে। বার বার বলছেন, ডাক্তার’কে বলো যতো টাকা লাগে দিবো। বাকি কথা খূব একটা বুঝি নাই। কিছুক্ষণ পর আমাদের কেবিনের বুয়া এসে জানালো বাচ্চা মেয়েটা বেঁচে নেই।

বুয়ার কাছ থেকেই শুনলাম ওরা গিয়েছিলো নিজেদের নতুন বাড়ী দেখতে। বাড়ীর কাজ তখনও চলছিলো। মেয়েটা পুরো বাড়ী জুড়ে ছুটো-ছুটি করে খেলছিলো। দোতলা কিংবা তিনতলার বারান্দার একটা ছোট দেয়াল ছিলো সদ্য তৈরী করা। মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে সেটাতেই ভর দিয়েছিলো, সদ্য নির্মিত সেই দেয়াল ভার নিতে পারে নাই। ভেঙ্গে একেবারে নিচে পরে যায়। মাথাটা পরেছিল ইটের টুকরার উপর, খুলি ভেঙ্গে মগজ বের হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তারদের কিছুই করার ছিলো না।

দুপুরের দিকে দাঁড়িয়ে আছি কেবিনের বারান্দায়। ২/৩টা গাড়ি এসে থামলো। সবাই পাঁজা কোলে ধরাধরি করে একজন ভদ্রলোককে ভিতরে নিয়ে গেলো। সবার পরিধেয় দেখে বুঝেছিলাম অফিস থেকে সরাসরি এসেছেন। কিছুক্ষণ পর আরেকটা গাড়িতে একজন ভদ্রমহিলা আর দু’জন ছেলে-মেয়ে আসলো। তারা ‘কি হয়েছে ভাই’ এই টাইপের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে করতে ভিতরে ঢুকলেন। দুই মিনিট ও হয় নাই, ছেলে আর মেয়েকে আগে আসা লোকজন ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে আসলো। উপর থেকে ঠিক বুঝতে পারি নাই, তবে মনে হচ্ছিলো ঘটনার আকষ্মিকতায় তারা দূ’জনেই হয়তো মূর্ছা গেছেন। কিছুক্ষণ পর মহিলাও বের হলেন বিলাপ করতে করতে। পরে শুনেছিলাম, ভদ্রলোক কোন এক সরকারি অপিসে কাজ করেন। হঠাৎ অসুস্থ্য বোধ করায় সহকর্মীরা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছেন আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

সবচেয়ে ভীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিলো মামা হার্ট এটাক করে যখন সোহরোওয়ার্দি হাসপাতালের হৃদরোগ ইনষ্টিটিউটের আইসিউউতে ভর্তি হলো। তখন খূব ছোট ছিলো আইসিইউ। ৪+৪ মোট ৮ বেড, মাঝে কিছুটা জায়গা। নতুন কোন রোগী আসলে সেখানেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হতো। রাত্রে সাধারণত আমি আর মামার ছোট মেয়ে জামাই একসাথে থাকতাম। আমাদের কাজ ছিলো এক-দেড় ঘন্টা পর পর রোগীর খোঁজ নিয়ে আসা। আইসিইউ এর সামনে মেঝেতে শুয়ে বসে গল্প করে কাটাতাম। রাতের পালায় ডাক্তার-সিস্টার থাকতো কম। তবে তারা যথেষ্ঠই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন দক্ষ হাতে।

মাঝে মধ্যেই দেখা যেতো মাঝরাতে রোগী এসেছে, অবস্থা ক্রিটিক্যাল। চোখের পলকে ডাক্তার-নার্স-ওয়ার্ড বয় ঝাঁপিয়ে পড়তেন কাজে। কোন সময় রোগী কিছুটা ষ্ট্যাবল অবস্থায় চলে আসতো, কখনও শত চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানো যেতো না। তখন হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি বলতে যা বুঝায় তাই হতো। তখন আশে-পাশের রোগীর লোকজনই এগিয়ে আসতো তাদের সান্তনা দিতে।

কয়েকদিন একনাগাড়ে হাসপাতালে থাকায় ডাক্তার-নার্সের সাথেও ভাল একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। প্রয়োজনে তারাও আমাদের সাহায্য চাইতেন, আমরাও এগিয়ে যেতাম সানন্দেই। বিশেস করে সাপ্তাহিক ছুটির রাত্রে রোগীর চাপ থাকতো অস্বাভাবিক বেশী। ডাক্তার’কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ডাক্তার কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – এটা আপনার চোখে পড়েছে ? পরে বললেন ছুটির দিনে সাধারণত বিয়ের দাওয়াত থাকে, এছাড়া ভাল-মন্দ খাওয়া-দাওয়া হয়। রাত্রে পেটে গ্যাস জমে প্রচন্ড চাপ তৈরী করে। ফলাফল অনেকটা হার্ট এটাকের মতোই। পেটের গ্যাস রিলিজ হয়ে গেলেই আবার অবস্থা নরমাল হয়ে আসে।

একদিনের কাহিনী বলি। সেদিন হয়তো সাপ্তাহিক ছুটি ছিলো, আমার ঠিক মনে নেই। একজনের পর একজন রোগী আসছেন। ডাক্তার-সিস্টাররা একটু জিরিয়ে নেয়ার ফুসরত পাচ্ছেন না। একসময় দেখা গেলো ৪ জন রোগী একসাথে চলে এসেছেন। ছোট জায়গায় সবাইকে ঢোকানোই যাচ্ছে না। ভিতর থেকে ওয়ার্ড বয় এসে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে নিলো ভিতরে। ডাক্তার সাহেব বললেন ভিতরের রোগীদের বেড একটু একটু সরিয়ে অন্য রোগীদের ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। উপায় না দেখে সেদিন তাই করা হয়েছিলো। আবার এক সমস্যা, এক্সট্রা মনিটর নাই। আগে থেকে থাকা রোগী যাদের অবস্থা কিছুটা বেটার তাদের মনিটর খুলে নতুন আসা রোগীদের লাগানো হচ্ছিলো। তাতে আবার আগের রোগী এবং তাদের আত্বীয়-স্বজনদের আপত্তি। সেসময়েই এক রোগী আসলেন, মনিটর লাগানোর পর দেখা গেলো মনিটরের সব লাইন ফ্ল্যাট হয়ে আছে। ডাক্তার দেখে প্রথমে বললেন পায়ে কি একটা ইঞ্জেকশন দিতে। সেটা দেয়ার পরও লাইট ফ্ল্যাট হয়েই রইলো। এরপর ডাক পড়লো ওয়ার্ড বয়ের। আমরা আইসিউউ এর বাইরে থেকে সব দেখছি। ওয়ার্ড বয় তৈরী হলো ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার জন্য। বার দূ’য়েক শক দেয়ার পর মনিটরের লাইনগুলো লাফাতে লাফাতে সরতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর লাইন আবার ফ্ল্যাট হয়ে গেলো। আবারও একই ভাবে তাকে এই নশ্বর জগতে ফিরিয়ে আনা হলো। সেদিন মনে হয় এই কান্ড বার তিনেক হয়েছিলো। ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার সাথে সাথেই যে ভাবে পুরো বডি লাফিয়ে উঠে, কেমন যেন লাগে। পরদিন অবশ্য ভদ্রলোককে আইসিইউ এর বাইরে ওয়ার্ডের বেডে বসে গল্প করতে দেখেছিলাম। আমি গিয়ে তার সাথে শেক হ্যান্ডস করার পর ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে বললাম গত রাত্রে আমি আপনাকে ৩ বার মরতে দেখেছি ৩ বার বাঁচতে দেখেছি।

সে রাত্রে আরেকটা ঘটনা ঘটেছিলো। ৮ নাম্বার বেডে যে ভদ্রলোক ভর্তি ছিলেন কিছুদিন ধরে, তিনি প্রায় সময়ই দেখতাম কি যেন বিড় বিড় করে বলতে থাকেন। বুঝা যায় না। মাঝে শধ্যে অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বকাঝকাও করেন। সেদিন ডাক্তার নার্স আর ওয়ার্ড বয় যখন রোগীর স্রোত সামলাতে ব্যস্ত, তিনি কি করে যেন খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। পড়ার কথা ছিলো না, কারণ দুই সাইডেই রেলিং দেয়া ছিলো। তারপরও পড়েছেন এবং সে অবস্থাতেই বকছিলেন। সিষ্টার আমাদের আবার ডেকে নিলেন ভদ্রলোককে বিছানায় তোলার জন্য। তুলতে গিয়ে দেখা গেলো তার লুঙ্গি খুলে গেছে। তাকে লুঙ্গি পড়িয়ে আবার বিছানায় তোলা হলো। তখনও তিনি বকা দিয়েই যাচ্ছেন। কিভাবে পড়লেন জিজ্ঞেস করাতে বললেন বাথরুমে যেতে গিয়ে।

হাসপাতাল ডিউটি করতে গিয়ে কখনও কখনও কাউকে খূব আপনজন মনে হয়। কেউ হাসি মূখে বিদায় নেয়। কারো বিদায়ের সময় নিজেরই হয়তো কান্না পেয়ে যায়।

বিচিত্র এই জীবন !!!

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।