একটি ছবি, বৃদ্ধাশ্রম এবং …

দাদী-নাতনীএবছর (২০১৮) বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস (১৯শে আগষ্ট) এ একটি ছবি অন্তর্জালে বেশ ভাইরাল হয়ে উঠেছিলো। ছবিতে দেখা যায় কোন এক স্কুলের কিশোরী ছাত্রী এবং একজন বৃদ্ধ মহিলা কাঁদছেন। বর্ণনায় বলা ছিলো কোন এক স্কুলের ছাত্রীদের স্থানীয় এক বৃদ্ধাশ্রমে নেয়া হলে ছবির সেই ছাত্রীটি তার দাদীকে সেই বৃদ্ধাশ্রমে আবিস্কার করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তার বাবা-মা নাকি তাকে বলেছিলো তার দাদী কোন এক আত্মীয়ের বাসাতে থাকেন। যারা ছবি পোষ্ট করছিলেন তারা অবশ্য নিজেদের মতো করে সেই সব কুলাঙ্গার সন্তানদের সমালোচনা করছিলেন যারা আপন বাবা-মা’কে শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেন।

আমার অবশ্য প্রথমে মাথায় আসলো ঘটনা আসলে কি। গুগল এবং আরো কিছু ওয়েব বেসড সার্ভিসের কল্যানে ছবি দিয়ে সার্চ করা এখন বেশ সহজ। সার্চ দিতেই জানা গেলো এই ছবিটি আসলে এক দশক আগের ২০০৭ সালের। বিবিসি গুজরাটি সার্ভিসে তখন এই ঘটনাটি প্রচার করা হয়েছিলো। এবছর বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস উপলক্ষে বিবিসি গুজরাটি সার্ভিস স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে জানতে চায় তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ফটোষ্টোরি সম্পর্কে। তখনই মূল আলোকচিত্রী Kalpesh S Bharech শেয়ার করেন তার তোলা এই ছবিটি, মূহুর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি। বিস্তারিত পাবেন এই লিংকে

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে কেন বৃদ্ধ বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমে অথবা অন্য কোথাও মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন ? অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণ থাকলেও সেগুলো হয়তো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিশাল কোন কারণ না। সাধারণ চাকুরিজীবি মাত্রই এদেশে সবাই চেষ্টা করেন ভবিষ্যতের জন্য একটি বাড়ী এবং কিছু সঞ্চয় করে যেতে। আর যারা সরকারী চাকরি করেন তারা অবসরকালীন ভাতা সহ এককালিন বেশ কিছু টাকা হাতে পান। তারপরও দেখা যায় নিজের তৈরী বাড়ী থেকেও হয়তো কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য হন, সঞ্চয়ের টাকা ছেলেমেয়ের কল্যানে তাদের হাতে তুলে দিয়ে।

আমার ব্যক্তিগত ধারণা এই অবস্থা তৈরীর পিছনে আসলে নিজের বাড়ী থেকে বিতারিত বৃদ্ধাশ্রমে থাকা সেই বাবা-মাও হয়তো দায়ী। তারা যখন ছেলে-মেয়ে মানুষ করেছিলেন, তখনকার তাদের কোন আচরণ হয়তো ছেলে-মেয়ের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিলো। আমি এপ্রসঙ্গে আমার এক নিকটাত্মীয়ের গল্প বলতে পারি। এই গল্পিটি আমি আগেও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছি। অনেকেই হয়তো জানেন। অনেকেরই হয়তো ঝুলিতে এরকম অনেক ঘটনাই আছে।

এই ঘটনার পাত্র-পাত্রীরা কেউই এখন আর এই জগতে নেই। তিনি ছিলেন সম্পর্কে চাচা। চাচা এবং চাচী দূজনেই আমাদের খূব স্নেহ করতেন। যখনই তাদের বাসায় গিয়েছি আদরের কমতি হয়নি। অথচ এই চাচীই দেখতাম দাদীর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্যরকম। কেবল গায়ে হাত তোলা ছাড়া কেবল মূখের ভাষায় যে একজনকে এভাবে হেনস্থা করা সম্ভব সেটা দেখেছিলাম আমার সেই চাচী আর দাদীর সম্পর্কে। একটি ঘটনার কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন ছিলো আমার চাচাতো ভাই এর বিয়ের দিন। আমরা সহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনরা বিয়ে উপলক্ষে জড়ো হয়েছি চাচার সরকারী বাসায়। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো বরযাত্রা হবে। এর মধ্যেই শোনা গেলো চাচীর চিৎকার। চিৎকারের লক্ষ্যবস্তু দাদী। ঘটনা আসলে সামান্য। চাচাত ভাই বিয়ে উপলক্ষে বাসার সবার জন্যই সাধ্যমতো জামা-কাপড় কিনেছে। দাদীর জন্য শাড়ী কিনে এনেছিলো। দাদী সেই শাড়ী পড়ে রেডি হয়েছেন, কিন্তু তার কোন ভাল ব্লাউজ ছিলো না সাথে পড়ার জন্য। ব্লাউজের কথা বলার হয়তো সাহসই পাননি। বাসার কেউ হয়তো সেটা খেয়ালও করেননি। অভ্যাগতদের কেউ একজন ব্লাউজের ব্যাপারে প্রশ্ন করতেই সেটা শুনে ফেলেছেন চাচী, আর সাথে সাথে শুরু হয়েছে তার বাক্যবাণ। চিৎকারের সারমর্ম হলো এই বুড়ি আজতক তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় নাই, আজ বড় ছেলের বিয়েতেও সবার সামনে তাকে ছোট করে দিলো ব্লা ব্লা ব্লা। দাদী তখন নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন আর চাচা (!?!) বরাবরের মতো মুখের সামনে পত্রিকা ধরে নির্লিপ্ত ভাব ধরে আছেন। আমি যে কয়বারই চাচী আর দাদীর এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, চাচাকে কোনদিনই বিন্দুমাত্র কিছু বলতে বা করতে দেখিনি। সেদিন কিভাবে সেই ব্লাউজের সমস্যা সমাধান করা হয়েছিলো আজ আর মনে নেই। কেবল মনে আছে অভ্যাগতরাই উদ্যোগী হয়ে দাদীকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছিলেন।

এরপরের ঘটনা আরো কয়েক বছর পরের। আব্বা অফিস থেকে এসে জানালেন চাচী সন্ধ্যার পর বাসায় আসবেন। এরমধ্যে দাদী এবং চাচা, দু’জনেই গত হয়েছেন। চাচাত ভাই বৌ নিয়ে কোন এক মফস্বল শহরে থাকেন চাকরি সূত্রে। অন্যান্য ভাই-বোনরাই জীবিকার তাগিদে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। চাচী থাকেন দেশের বাড়ীতে তার স্বামীর ভিটায়। সন্ধ্যার পর চাচী আসলেন, আমরা গিয়ে দেখা করলাম। বরাবরের মতোই তার কথায় ছিলো স্নেহের পরশ। দেখা সাক্ষাতের পর আমরা চলে আসলাম অন্যরুমে, চাচী নাকি আব্বা-আম্মার  সাথে কোন এক বিষয় নিয়ে আলাপ করবেন। আমরা পাশের রুম থেকে শুনতে পেলাম চাচী কাঁদছেন প্রবলভাবে আর বড়ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোেগ করছেন আব্বা-আম্মার কাছে। সারমর্ম হলো বিয়ের পর থেকেই ছেলে তার পর হয়ে গেছে। মা’র খোঁজখবর ঠিকমতো নেয় না, মা কি খায় কি পড়ে সেসম্পর্কে কোন কিছু জিজ্ঞেসও করে না। সেই যে বিয়ের সময় কিছু শাড়ী কিনে দিয়েছিলো, এরপর আর কোন কাপড় কিনে দেয় নাই। আমি অন্য রুম থেকে চাচীর প্রবল কান্না শুনছিলাম আর আমার চোখের সামনে ভাসছিলো সেই বিয়ের দিন দাদীর সেই নতমুখে নিরবে চোখের পানি ফেলার দৃশ্যটি। আব্বা-আম্মা সবকিছু জেনেও যতোটা সম্ভব চাচীকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন।

রাত্রে আব্বা খেতে বসে আমাদের বলছিলেন কাউকে চরম কষ্ট দিলে সেটা এক সময় না একসময় ফিরে আসবেই। টিট ফর ট্যাট !!!

আমি হয়তো হাতে গোনা কয়েকবার দাদীর প্রতি চাচীর এই অমানবিক আচরণ দেখেছি, দেখেছি চাচার নির্লিপ্ত রুপ। চাচাত ভাই বোনরা হয়তো জন্ম থেকেই এই অবস্থার সাথে পরিচিত। তারা নিজেরা যখন সংসারে ঢুকেছে মা কে এইভাবে অবজ্ঞা করা হয়তো তাদের কাছে স্বাভাবিকই ছিলো। যেন জগতের নিয়মই এই।

সুতরাং আপনি আপনার ছেলে-মেয়েকে যেভাবে শিক্ষা দিচ্ছেন সেটার সুফল কিংবা কুফল আপনাকেই হয়তো ভোগ করতে হবে। আর শিক্ষা শুধূ স্কুলে পাঠিয়ে, বলে-কয়ে কিংবা নীতিবাক্য আউড়িয়ে হয় না। আপনার আচরণ থেকেও আপনার সন্তান অনেক কিছু শিখবে। আর সেই শিক্ষা তার মন থেকে কখনই মুছতে পারবেন বলে মনে হয় না।

ছবি সংগৃহিত
ফটোগ্রাফার : Kalpesh S Bharech

রিফাত জামিল ইউসুফজাই

জাতিতে বাঙ্গালী, তবে পূর্ব পূরুষরা নাকি এসেছিলো আফগানিস্তান থেকে - পাঠান ওসমান খানের নেতৃত্বে মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। লড়াই এ ওসমান খান নিহত এবং তার বাহিনী পরাজিত ও পর্যূদস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামে। একসময় কালিহাতি উপজেলার চারাণ গ্রামে থিতু হয় তাদেরই কোন একজন। এখন আমি থাকি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। কোন এককালে শখ ছিলো শর্টওয়েভ রেডিও শোনা। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে একমাত্র কাজ ছিলো একটি ডিজিটাল রেডিও কেনা। ১৯৯০ সালে ষ্টকহোমে কেনা সেই ফিলিপস ডি ২৯৩৫ রেডিও এখনও আছে। দিন-রাত রেডিও শুনে রিসেপশন রিপোর্ট পাঠানো আর QSL কার্ড সংগ্রহ করা - নেশার মতো ছিলো সেসময়। আস্তে আস্তে সেই শখ থিতু হয়ে আসে। জায়গা নেয় ছবি তোলা। এখনও শিখছি এবং তুলছি নানা রকম ছবি। কয়েক মাস ধরে শখ হয়েছে ক্র্যাফটিং এর। মূলত গয়না এবং নানা রকম কার্ড তৈরী, সাথে এক-আধটু স্ক্র্যাপবুকিং। সাথে মাঝে মধ্যে ব্লগ লেখা আর জাবর কাটা। এই নিয়েই চলছে জীবন বেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *